
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচল কমে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সোমবার ইরাকি বার্তা সংস্থা শাফাক নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচলে বড় ধস
শিপিং গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ১৩টি জাহাজ পার হয়েছে। পরদিন রোববার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ওই দিন এই জলপথ দিয়ে মাত্র চারটি জাহাজ চলাচল করেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করত। কিন্তু বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এক সপ্তাহে শতাধিক জাহাজ চলাচলের তথ্য
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের তথ্যেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ব্যাপকতার চিত্র পাওয়া যায়।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২১ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৮৯টি জাহাজ বের হয়েছে। একই সময়ে ১০৩টি জাহাজ এই জলপথে প্রবেশ করেছে।
তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জাহাজ চলাচল যে দ্রুত কমে এসেছে, কেপলারের সর্বশেষ তথ্য সেটিই স্পষ্ট করছে। যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় অনেক জাহাজ মালিক ও অপারেটর হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে পরিস্থিতি থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে ইরাক
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ইরাক। দেশটির অর্থনীতির জন্য তেল রপ্তানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের বাসরা বন্দর থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বাসরা বন্দর থেকে ইরাকের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
জুলাইয়ে ইরাকের তেল রপ্তানি দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেলে উঠেছিল। অথচ যুদ্ধের আগে বাসরা বন্দর থেকে প্রতিদিন ৩৩ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করা হতো।
অর্থাৎ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ইরাকের তেল রপ্তানি সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব দেশটির রাজস্ব আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
বিকল্প রপ্তানি পথ খুঁজছে বাগদাদ
হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে এখন বিকল্প তেল রপ্তানি পথ খুঁজছে ইরাক সরকার। এ জন্য তুরস্ক, সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্য দিয়ে তেল পরিবহনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বাগদাদ।
বিকল্প রুট হিসেবে সিরিয়ার বানিয়াস বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি নতুন পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ নয়। প্রস্তাবিত পাইপলাইন নির্মাণে প্রায় চার বছর সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে অন্তত ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প তৈরি করতে ইরাককে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নিতে হবে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার ঘটনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ এই প্রণালি।
এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে যেসব দেশ উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিকল্প পথের গুরুত্ব বাড়ছে
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বিকল্প তেল পরিবহনপথের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে পাইপলাইন ও অন্যান্য স্থলভিত্তিক রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
তবে নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে সময় ও বিপুল অর্থ প্রয়োজন। ফলে স্বল্পমেয়াদে হরমুজ প্রণালির সংকট মোকাবিলা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প রুট তৈরি—দুই দিকেই দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাওয়ার ঘটনা শুধু আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও বড় ধরনের সতর্কবার্তা। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহন ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরবর্তী পরিস্থিতি।