
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিংকে শুধু দলটির নিজস্ব বক্তব্য হিসেবে দেখছেন না জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, দিল্লিতে আওয়ামী লীগের ওই কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ভারত সরকারের অবস্থান ও বাংলাদেশকে দেওয়া বার্তাই প্রকাশ পেয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড ও ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরতে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, দিল্লিতে আওয়ামী লীগের প্রেস ব্রিফিং কেবল দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এর মাধ্যমে ভারত সরকার বাংলাদেশ সম্পর্কে কী বলতে চায়, সেটিও প্রকাশ পেয়েছে বলে তারা মনে করেন।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, ভারত সরকারের সহযোগিতা ও মদদ ছাড়া দিল্লিতে আওয়ামী লীগের এ ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে ভারতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া এবং বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা—দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দিল্লিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারত সরকারের বা দিল্লির সহযোগিতা ছাড়া আওয়ামী লীগের এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। তাঁর মতে, ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণের দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ভারত সরকারের প্রতি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারত যদি গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের ফেরত দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
তাঁর মতে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, সেটিও নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।
গঙ্গা চুক্তি ও সীমান্ত ইস্যুতে নতুন সম্পর্কের আহ্বান
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি বলেন, গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি সামনে রেখে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ বন্ধ, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং দুই দেশের মধ্যে ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব বিষয়কে ভিত্তি করেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়েও প্রশ্ন
শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করার সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে এর রাজনৈতিক বার্তা কী দাঁড়াবে—এমন প্রশ্নও তোলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ ধরনের পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখবে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলামের দাবি, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা বাংলাদেশের জন্য অবমাননাকর বার্তা দিতে পারে। তাঁর মতে, এতে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে কিংবা সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছে না।
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে এনসিপির সমালোচনা
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডেরও কঠোর সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, এই সময়ে সরকারের বিভিন্ন ভুল, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং নীতিগত ব্যর্থতা জনগণের সামনে তুলে ধরছে এনসিপি। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলে জানান তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষায়, এনসিপি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থেকে পুরনো রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখছে।
তিনি অভিযোগ করেন, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও পরিকল্পনাহীনতার মধ্য দিয়ে সরকার আবার ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে ফিরে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডে প্রমাণিত হয়েছে যে দেশ পরিচালনায় তারেক রহমানের সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও বক্তব্য হিসেবে এসেছে।
সরকারবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি
সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিষয়ে এনসিপির আহ্বায়ক জানান, ১১ দলের বৈঠক থেকে এরই মধ্যে লং মার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি জানান, দেশের প্রায় পাঁচ থেকে ছয়টি বিভাগে লং মার্চ কর্মসূচি পালনের পর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ওই মহাসমাবেশ থেকে সরকারকে বড় ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হবে।
প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে উপজেলা, জেলা ও মহানগর পর্যায়েও এনসিপির রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে উল্লেখ করেন।
‘বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছি’
গত ছয় মাসে বিরোধী দল হিসেবে এনসিপি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে বলেও দাবি করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কঠোর আন্দোলনে গেলে সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনকে নিজেদের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তুলে ধরতে পারত। এ কারণে সরকারকে ছয় মাস কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে একই সময়ে বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে সরকারের অবস্থান ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদের দুই অধিবেশনে বিভিন্ন বিষয় ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংসদের বাইরেও গণতান্ত্রিক ও অহিংস কর্মসূচি পালন করেছে এনসিপি।
তাঁর দাবি, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, বিরোধী দল হিসেবে এনসিপি সেই পরিবর্তনের চর্চা করেছে। নীতিগত আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে সংসদে এবং সংসদের বাইরে সরকারের ভুলগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
বিরোধী দলের কর্মসূচিতে হামলার অভিযোগ
বিরোধী দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে হামলার অভিযোগও করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির জবাব সরকারের পক্ষ থেকে সহিংসতার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, একজন নেতাকর্মী চোখ হারিয়েছেন এবং গাইবান্ধায় একজন নিহত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিরোধী দলের কর্মসূচিতে হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।
সংসদে বিরোধী দলের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধী দল সংসদের অংশ হলেও সরকার পরিচালনার অংশ নয়। এখনো সংবিধান সংশোধন বা কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্পন্ন হয়নি।
জুলাই সনদ অনুযায়ী বিরোধী দলকে আরও ক্ষমতাশালী করার যে পরিকল্পনা ছিল, সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। ফলে সংসদে বিরোধী দল তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের কথা বলার সুযোগও সীমিত বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সরকার যদি মনে করে তাদের কোনো বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনা নেই কিংবা তারা কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে, তাহলে বিরোধী দলের কাছ থেকে নীতিগত সহায়তা নিতে পারে। বিভিন্ন সময়ে এনসিপি এ ধরনের সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
‘সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতেই প্রচারণা’
বিরোধী দল হিসেবে এনসিপি ব্যর্থ বা দুর্বল—এমন প্রচারণারও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি দাবি করেন, সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতেই বিরোধী দলের সক্ষমতা নিয়ে এ ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি দীর্ঘ ১৬ বছর বিরোধী দল হিসেবে বাংলাদেশে ব্যর্থভাবে কাজ করেছে। তবে এনসিপির বিরোধী দল হিসেবে কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য আরও সময় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য, আগামী আরও ছয় মাস পর বাংলাদেশের জনগণই বিচার করবে বিরোধী দল হিসেবে এনসিপি কতটা সক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে একদিকে দিল্লিতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন ভিত্তিতে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।
পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান এবং দুই দেশের মধ্যে সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থ—এসব বিষয়কে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছেন তিনি।
সব মিলিয়ে দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিংকে কেন্দ্র করে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক, শেখ হাসিনার অবস্থান এবং বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড—সবকিছুই আলোচনায় এসেছে।
তবে তাঁর বক্তব্যের বেশির ভাগ অংশই রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগনির্ভর। এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগ, ভারত সরকার এবং বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন কোনো বক্তব্য এ প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হয়নি।