• হোম > বাংলাদেশ > ধানমন্ডি লেকে নতুন সাংস্কৃতিক স্থাপনা ‘নজরুল সরোবর’

ধানমন্ডি লেকে নতুন সাংস্কৃতিক স্থাপনা ‘নজরুল সরোবর’

  • সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৩৬
  • ১০

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র ধানমন্ডি লেককে আরও আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে ৭৫ কোটি টাকার সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, অবকাঠামোর অবনতি ও পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলার পাশাপাশি লেক এলাকায় নতুন বিনোদন ও সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির লক্ষ্য রয়েছে এই উদ্যোগে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট বরাদ্দের মধ্যে ৫০ কোটি টাকা ধানমন্ডি লেক সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নে এবং ২৫ কোটি টাকা ‘নজরুল সরোবর’ নির্মাণে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন এই সাংস্কৃতিক স্থাপনাটি ‘বিদ্রোহী চত্বর’ নামেও পরিচিত হবে।

ধানমন্ডি লেকের মোট আয়তন প্রায় ৮৬ একর। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ একর জলাশয়। পুরোনো পাণ্ডু নদীর অবশিষ্ট জলাভূমিকে কেন্দ্র করে ১৯৬০-এর দশকে গড়ে ওঠা এই লেক সময়ের সঙ্গে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সবুজ এলাকা ও বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

তবে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে লেকের বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেও ধানমন্ডি লেকের কিছু অংশ এবং আশপাশের এলাকায় পানি জমে জনভোগান্তি সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি লেকের পাড়, হাঁটার পথ, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোও সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

লেক সংস্কারে যেসব কাজ হবে

ডিএসসিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধানমন্ডি লেকের পাড় সুরক্ষা, ঢাল স্থিতিশীল করা এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। একই সঙ্গে পুরোনো হাঁটার পথ সংস্কার, আলোকসজ্জা উন্নয়ন, সীমানাবেষ্টনী ও নিরাপত্তা রেলিং মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

লেককে আরও আকর্ষণীয় করতে পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে তিনটি ভাসমান ডেক, কিয়স্ক, আধুনিক জিম, লাইব্রেরি, প্রদর্শনী গ্যালারি, ক্যাফেটেরিয়া ও অ্যাম্ফিথিয়েটার। পাশাপাশি ব্যাডমিন্টন কোর্ট, উন্মুক্ত ব্যায়ামের স্থান এবং পার্কিং সুবিধাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। লেকের আশপাশের গাছের পরিচর্যা ও চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষায়িত ‘ট্রি হাসপাতাল’ স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থা, আধুনিক নির্দেশনামূলক সাইন, পথনির্দেশ ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং গণঘোষণা ব্যবস্থাও স্থাপন করা হবে।

২৫ কোটি টাকায় ‘নজরুল সরোবর’

প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর ‘নজরুল সরোবর’। আনুমানিক ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ধানমন্ডির ১৩/এ ও ৮/এ সড়কের পাশে, কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ঠিক বিপরীতে প্রায় ৫০ দশমিক ৯৬৭ কাঠা জমিতে এই স্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এখানে কবি নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও বিদ্রোহী চেতনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হবে। নজরুলসংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার জন্য থাকবে উন্মুক্ত অ্যাম্ফিথিয়েটার। শিল্পীদের জন্য গ্রিনরুমের ব্যবস্থাও রাখা হবে।

এ ছাড়া কবি নজরুলের পছন্দের কিছু খাবার পরিবেশনের জন্য একটি রেস্তোরাঁ, জনসাধারণের জন্য শৌচাগার এবং কবির জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে তথ্যফলক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব তথ্যফলকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও তুলে ধরার কথা রয়েছে।

নজরুলের সাহিত্য ও বিদ্রোহী চেতনাকে ঘিরে একটি বুক কর্নার, নগর বন এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য প্রধান প্লাজা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। লেকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে একটি ঘাট এবং দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য আলাদা হাঁটার পথ নির্মাণ করা হবে।

ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এই স্থাপনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে কবি নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্মের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ানো এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি উপযোগী ও আধুনিক পরিসর তৈরি করা। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের কাছাকাছি হওয়ায় কবির সাহিত্যকর্ম প্রচারেও এটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লেকের তলদেশ পরিষ্কারের উদ্যোগ

ধানমন্ডি লেকের সংস্কারকাজের আগে এর তলদেশ পরিষ্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ডিএসসিসির অঞ্চল-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয় জানিয়েছেন, লেকের তলদেশ পরিষ্কারের আগে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হতে প্রায় ৭০ দিন সময় লাগতে পারে। পরীক্ষামূলক কাজের ফলাফল পর্যালোচনা করে লেকের তলদেশ পরিষ্কারের পর মূল সংস্কারকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিএসসিসি জানিয়েছে, নিজেদের অর্থায়নেই ৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হবে।

নতুন সাংস্কৃতিক স্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন

ধানমন্ডি লেক উন্নয়নের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও নতুন সাংস্কৃতিক ভেন্যু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান।

তার মতে, প্রস্তাবিত ‘নজরুল সরোবর’ রবীন্দ্র সরোবরের খুব কাছাকাছি হওয়ায় একই এলাকায় দুটি সাংস্কৃতিক ভেন্যু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনা করা উচিত। রবীন্দ্র সরোবরে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের কারণে এরই মধ্যে শব্দদূষণ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আদিল মুহাম্মদ খান অতিরিক্ত কংক্রিটনির্ভর উন্নয়ন এড়িয়ে গাছপালা, খোলা জায়গা ও প্রকৃতিবান্ধব ল্যান্ডস্কেপিংকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় বাসিন্দা, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

তার আশঙ্কা, যথাযথ পরিকল্পনা ও অংশীজনদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা না হলে অতীতের কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের মতো এখানেও অপ্রয়োজনীয় কাজের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ধানমন্ডি লেকের সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সবুজ ও বিনোদনকেন্দ্রটির পরিবেশ, অবকাঠামো এবং নাগরিক সুবিধায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রকল্পের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে পরিবেশ সংরক্ষণ, সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজনকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তার ওপর।

 

 


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15725 ,   Print Date & Time: Monday, 24 August 2026, 09:38:24 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh