
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাগত দক্ষতা, সততা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও শৃঙ্খলার ভিত্তিতে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (২৩ আগস্ট) ঢাকার বিমানবাহিনী সদর দপ্তরে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ‘নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে তিনি এ নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী পর্ষদের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কোনোভাবেই বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত নয়। বরং কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা, শৃঙ্খলার মান, সততা, বিশ্বস্ততা, আনুগত্য এবং সর্বোপরি দায়িত্ব পালনের উপযুক্ততার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
নৌবাহিনী প্রধানকে অ্যাডমিরাল র্যাংক ব্যাজ
নির্বাচনী পর্ষদের কার্যক্রম শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধান খোন্দকার মিসবাহ উল আজীমকে অ্যাডমিরাল র্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দেন। পরে তাকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় নৌবাহিনী প্রধান বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে নৌবাহিনীকে আরও আধুনিক, সক্ষম ও সময়োপযোগী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা কামনা করেন।
এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন যেসব কর্মকর্তা
‘নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর মাধ্যমে দুই বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের যোগ্য কর্মকর্তাদের পরবর্তী পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হবে।
নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন, কমান্ডার ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এবং বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন, উইং কমান্ডার ও স্কোয়াড্রন লিডার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এ প্রক্রিয়ার আওতায় থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার ক্ষেত্রেও দুই বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
দেশের প্রয়োজনে নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের ত্যাগ ও দায়িত্বশীলতার জন্য প্রধানমন্ত্রী দুই বাহিনীর প্রধানসহ সব সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ
নির্বাচনী পর্ষদের বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন।
একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ, যুদ্ধাহত ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। বিশেষভাবে সশস্ত্র বাহিনীর শহীদ ও বীর সদস্যদের আত্মত্যাগের কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের শহীদ এবং ১৯৭১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে হতাহতদের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
বিমানবাহিনীর আধুনিক সক্ষমতা পরিদর্শন
নির্বাচনী পর্ষদের উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী বিমানবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল ও গবেষণামূলক স্থাপনা পরিদর্শন করেন।
প্রথমে তিনি ঢাকা সেনানিবাসের আকাশ প্রতিরক্ষা পরিচালন কেন্দ্রে স্থাপিত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের (এডিএসআই) উদ্বোধনী স্মারক ফলক উন্মোচন করেন। পরে নবউদ্বোধিত এডিএসআইয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
এরপর তিনি বিমানবাহিনীর এয়ার কমান্ড অপারেশন সেন্টার (এসিওসি) পরিদর্শন করেন। সেখানে ডিজিটাল লার্জ ডিসপ্লের মাধ্যমে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান দিয়ে শত্রুবিমানকে প্রতিহত করার কার্যক্রম এবং চট্টগ্রাম থেকে ইউএভির (আনম্যানড এরিয়াল ভেহিক্যাল) লাইভ ফিডের মাধ্যমে হেলিকপ্টারে সেনা অবতরণের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রোন প্রদর্শন
পরে প্রধানমন্ত্রী বিমানবাহিনীর অ্যারোস্পেস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কমপ্লেক্স (এআরডিসি) পরিদর্শন করেন। সেখানে চলমান বিভিন্ন গবেষণা ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রম সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়।
এ সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় তৈরি বিভিন্ন ধরনের ইউএভি বা ড্রোন প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ড্রোন, কামিকাজি ড্রোন, ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ও ভি-টল প্রযুক্তির উড্ডয়ন ব্যবস্থা ছিল।
প্রধানমন্ত্রী একটি কোয়াডকপ্টারের উড্ডয়নও পর্যবেক্ষণ করেন। নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় আধুনিক উড্ডয়ন ব্যবস্থা তৈরি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাহিনীর আধুনিকায়নে গুরুত্ব
বর্তমান সময়ে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবন একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর নিজস্ব প্রযুক্তিতে ড্রোন ও অন্যান্য উড্ডয়ন ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে যোগ্যতা, সততা ও নেতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও সক্ষমতা আরও বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
‘নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, প্রতিরক্ষা সচিবসহ সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।