
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার ম্যাকাই টেস্ট শেষ হয়েছে মাত্র ৭৫০ বলে। মাত্র দুই দিনেই শেষ হওয়া এই টেস্টে ব্যাটারদের তুলনায় বোলারদের দাপটই ছিল বেশি। দুই দল মিলে যেখানে সংগ্রহ করেছে মাত্র ৩৬৯ রান, সেখানে ম্যাচটিতে তৈরি হয়েছে একের পর এক বিরল রেকর্ড।
বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার শরীফুল ইসলাম অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৭ উইকেট নিয়ে গড়েছেন বিশেষ কীর্তি। দীর্ঘ ১৪০ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কোনো বাঁহাতি পেসার হিসেবে এক ইনিংসে সাত উইকেট নেওয়ার নজির গড়েছেন তিনি। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার পেসার মিচেল স্টার্কও ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে নিজের রেকর্ডের খাতায় যোগ করেছেন নতুন অধ্যায়।
ম্যাকাই টেস্টের উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যানগুলো তুলে ধরা হলো—
৭৫০ বলে শেষ টেস্ট
ম্যাকাই টেস্টের ফল নির্ধারণে লেগেছে মাত্র ৭৫০ বল। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি চতুর্থ সংক্ষিপ্ততম ম্যাচ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত টেস্টগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় সংক্ষিপ্ততম ম্যাচ।
দুই দিনের মধ্যেই ম্যাচ শেষ হওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সাম্প্রতিক টেস্ট ক্রিকেটের আরেকটি চিত্রও সামনে এসেছে। দেশটির সর্বশেষ সাতটি টেস্টের মধ্যে তিনটিই মাত্র দুই দিনে শেষ হয়েছে।
দুই দল মিলে ৩৬৯ রান
ম্যাকাই টেস্টে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া দুই দল মিলে করেছে মাত্র ৩৬৯ রান। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি ষষ্ঠ সর্বনিম্ন সম্মিলিত দলীয় সংগ্রহ।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত টেস্টের হিসাবেও এটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এর আগে ১৯৩২ সালে মেলবোর্নে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অনুষ্ঠিত টেস্টে দুই দল মিলে করেছিল মাত্র ২৩৪ রান।
প্রথমবার দুই ইনিংসেই শতরানের নিচে বাংলাদেশ
ম্যাকাই টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল চরম হতাশার। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৯৫ রান।
বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ম্যাচের দুই ইনিংসেই দলটি ১০০ রানের নিচে অলআউট হলো। এর আগে এক টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন সংগ্রহ ছিল ১৮৭ রান। ২০১৮ সালে নর্থ সাউন্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওই ম্যাচে এই রান করেছিল বাংলাদেশ।
এ ছাড়া ২০০৫ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ের পর প্রথম দল হিসেবে কোনো টেস্টের দুই ইনিংসেই ১০০ রানের নিচে অলআউট হলো বাংলাদেশ।
২১০ রান করেও অস্ট্রেলিয়ার বড় জয়
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে করেছে ২১০ রান। ইনিংস ব্যবধানে জয় পাওয়া দলগুলোর মধ্যে এটি চতুর্থ সর্বনিম্ন দলীয় স্কোর।
এর আগের তিনটি সর্বনিম্ন স্কোরের মধ্যে দুটিই ছিল অস্ট্রেলিয়ার। তবে সেগুলো ছিল ১৯৫০ সালেরও আগের ঘটনা।
মাত্র ১০৯ বলে স্টার্কের ১০ উইকেট
মিচেল স্টার্কের জন্যও ম্যাকাই টেস্টটি ছিল বিশেষ। ম্যাচে নিজের ১০ উইকেট পূর্ণ করতে তার লেগেছে মাত্র ১০৯ বল।
পুরুষদের টেস্ট ক্রিকেটে এর চেয়ে কম বলে ১০ উইকেট নেওয়ার নজির রয়েছে মাত্র চারজন বোলারের। ১৯১২ সালে ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফ্রাঙ্ক উলির ১০৪ বলের পর স্টার্কই সবচেয়ে কম বলে ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন।
এটি স্টার্কের ক্যারিয়ারের দ্রুততম ১০ উইকেটও। এর আগে গত বছর পার্থে অ্যাশেজ টেস্টে ১০ উইকেট নিতে তার লেগেছিল ১২৩ বল।
স্টার্কের চতুর্থ ১০ উইকেট
টেস্ট ক্রিকেটে এটি মিচেল স্টার্কের চতুর্থ ১০ উইকেট শিকারের ম্যাচ। অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের মধ্যে তার চেয়ে বেশি ১০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে কেবল ডেনিস লিলির—৭টি।
স্টার্কের চেয়ে বেশি ১০ উইকেট নেওয়া বোলারদের তালিকায় রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি পেসার ডেল স্টেইন। তার রয়েছে পাঁচটি ১০ উইকেটের ম্যাচ।
স্টার্কের বলে ৬ বাংলাদেশি ব্যাটারের ডাক
ম্যাকাই টেস্টে স্টার্কের বলে বাংলাদেশের ছয়জন ব্যাটার শূন্য রানে আউট হয়েছেন। এক ম্যাচে কোনো বোলারের ছয় ব্যাটারকে শূন্য রানে আউট করার ঘটনা টেস্ট ক্রিকেটে বিরল।
এর চেয়ে বেশি ব্যাটারকে শূন্য রানে আউট করার একমাত্র নজির রয়েছে জিম লেকারের। ১৯৫৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এক ম্যাচে আটজন ব্যাটারকে শূন্য রানে ফিরিয়েছিলেন তিনি।
এ ছাড়া পাকিস্তানের ইয়াসির শাহসহ মোট আটজন বোলার একটি ইনিংসে ছয় ব্যাটারকে শূন্য রানে আউট করার কীর্তি গড়েছেন।
স্টার্কের ১০ উইকেটের ৮টিই বাঁহাতি ব্যাটারের
মিচেল স্টার্কের শিকার হওয়া ১০ উইকেটের মধ্যে আটটিই ছিল বাঁহাতি ব্যাটারের। টেস্ট ক্রিকেটে এক ম্যাচে বাঁহাতি ব্যাটারদের বিপক্ষে এটি তার অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।
এর আগে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষেই নাথান লায়ন এক টেস্টে বাঁহাতি ব্যাটারদের ১০টি উইকেট নিয়েছিলেন, যা এই তালিকায় সর্বোচ্চ।
এ ছাড়া ট্রেন্ট বোল্ট, রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও মেহেদী হাসান মিরাজও এক টেস্টে আটজন বাঁহাতি ব্যাটারকে আউট করার কীর্তি গড়েছেন।
শরীফুলের ৭/৪৮, বাংলাদেশের পেসারদের ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে শরীফুল ইসলামের বোলিং ফিগার ছিল ৭ উইকেটে ৪৮ রান। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে এটি তৃতীয় সেরা বোলিং ফিগার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরীফুলই বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সাত উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন।
তার দুর্দান্ত স্পেল অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে বড় স্কোর থেকে আটকে দেয়। যদিও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণে সেই বোলিং পারফরম্যান্স ম্যাচের ফল নিজেদের পক্ষে আনতে পারেনি।
১৪০ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাঁহাতি পেসারের ৭ উইকেট
শরীফুলের ৭/৪৮ বোলিং ফিগারের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক রয়েছে। তার আগে সর্বশেষ ১৮৮৬ সালে কোনো বাঁহাতি পেসার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টের এক ইনিংসে সাত উইকেট নিয়েছিলেন।
সেই কীর্তি গড়েছিলেন ইংল্যান্ডের ডিক বার্লো। দীর্ঘ প্রায় ১৪০ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একই কীর্তিতে নাম লেখালেন বাংলাদেশের শরীফুল ইসলাম।
ফলে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের জন্য ম্যাকাই টেস্টটি হতাশার হলেও, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ও পরিসংখ্যানের দিক থেকে শরীফুল ইসলামের জন্য ম্যাচটি হয়ে থাকল স্মরণীয়।
সব মিলিয়ে মাত্র দুই দিনে শেষ হওয়া ম্যাকাই টেস্টে রান হয়েছে কম, কিন্তু রেকর্ড হয়েছে অনেক। শরীফুল ইসলামের ঐতিহাসিক ৭ উইকেট, মিচেল স্টার্কের দ্রুততম ১০ উইকেট এবং বাংলাদেশের দুই ইনিংসেই শতরানের নিচে অলআউট হওয়ার মতো একাধিক ঘটনা টেস্ট ক্রিকেটের পরিসংখ্যানের পাতায় আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছে।