• হোম > বিদেশ > ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

  • রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৭:২২
  • ১২

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

ইসরায়েলে এক ভারতীয় গৃহভিত্তিক কেয়ারগিভারকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় দেশটিতে কর্মরত হাজারো ভারতীয় শ্রমিকের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিহত কেয়ারগিভার রাজীব আচার্যের ঘটনায় ন্যায়বিচার, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং বিদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ইসরায়েলে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকরা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৩ জুলাই প্রবীণ এক দম্পতির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা রাজীব আচার্যকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একাধিকবার আঘাত করে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ওই দম্পতির নাতি অ্যাভিওর জাকেনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে।

শ্রমিকদের অভিযোগ ও দাবির প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি এখন শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে নয়, বরং ইসরায়েলে কর্মরত ভারতীয় অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয় হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাজীব হত্যায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি

এনডিটিভির তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকরা রাজীব আচার্য হত্যার ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং ইসরায়েলে কর্মরত ভারতীয় বিদেশি শ্রমিকদের সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাভিওর জাকেনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি দণ্ডবিধির আওতায় পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

রাজীব আচার্য নিহত হওয়ার প্রায় এক মাস পর তেল আবিবে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসও বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা জানিয়েছে।

দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত পরিস্থিতি ও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।

গৃহভিত্তিক কেয়ারগিভারদের ঝুঁকি বেশি

ভারতীয় শ্রমিকদের আবেদনে বিশেষভাবে গৃহভিত্তিক কেয়ারগিভারদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কারণ এ ধরনের কর্মীরা সাধারণত যে বাড়িতে প্রবীণ বা অসুস্থ ব্যক্তির দেখাশোনা করেন, সেখানেই বসবাস করেন।

ফলে কর্মস্থল ও আবাসস্থল একই জায়গায় হওয়ায় কোনো ধরনের সহিংসতা, নির্যাতন বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা দেখা দিলে তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাজীব আচার্য হত্যার ঘটনায় এই বাস্তবতাই নতুন করে সামনে এসেছে। শ্রমিকদের দাবি, বিদেশি কেয়ারগিভারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োগকর্তা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং দূতাবাসের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

ইসরায়েলে বাড়ছে ভারতীয় শ্রমিকের সংখ্যা

ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালের মে মাসে ভারত সরকার ইসরায়েলে ৪২ হাজারের বেশি ভারতীয় শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে একটি চুক্তি করে।

চুক্তি অনুযায়ী, প্রায় ৩৪ হাজার শ্রমিকের নির্মাণ খাতে এবং ৮ হাজার শ্রমিকের প্রবীণদের পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত হওয়ার কথা ছিল।

গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি সরকার বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি শ্রমিকের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে। এতে দেশটির নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেয়।

এই শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় ইসরায়েলি বিল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন ভারত থেকে আরও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক আনার আহ্বান জানায়। সংগঠনটি একপর্যায়ে ভারত থেকে ৫০ হাজার থেকে ৯০ হাজার শ্রমিক আনার প্রস্তাবও দেয়।

কর্মসংস্থানের আশায় ইসরায়েলে যাচ্ছেন ভারতীয়রা

ভারতে তুলনামূলক কম মজুরি ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে অনেক শ্রমিক ইসরায়েলে কাজের সুযোগকে আকর্ষণীয় হিসেবে দেখছেন। তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বিদেশে কাজ করে উপার্জিত অর্থ দেশে থাকা পরিবারের কাছে পাঠানো।

২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ২০ হাজারের বেশি ভারতীয় শ্রমিক ইসরায়েলে পৌঁছেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তিগুলো অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ইসরায়েলে সর্বোচ্চ এক লাখ ভারতীয় শ্রমিক যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের সম্ভাব্য আগমনকে সামনে রেখে তাদের কর্মপরিবেশ, অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নও গুরুত্ব পাচ্ছে।

শ্রমিক পাঠানো নিয়ে ভারতে বিতর্ক

ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারতেও বিতর্ক রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির কয়েকটি বড় ট্রেড ইউনিয়ন সরকারকে ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল।

তাদের যুক্তি ছিল, ইসরায়েলে শ্রমিক পাঠানোর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ও কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে ভারতীয় শ্রমিকদের পরোক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ইসরায়েলে কাজের সুযোগ ভারতীয় শ্রমিকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। একদিকে ইসরায়েলের শ্রমিক সংকট, অন্যদিকে ভারতের বিপুল কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী জনগোষ্ঠী—দুই দেশের প্রয়োজনের জায়গা থেকেই শ্রমবাজারে এই সহযোগিতা বাড়ছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন সামনে

রাজীব আচার্য হত্যাকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিদেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে গৃহভিত্তিক কেয়ারগিভাররা নিয়োগকর্তার ব্যক্তিগত বাসস্থানে কাজ ও বসবাস করায় তাদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলক কঠিন।

শ্রমিকদের দাবি, এ ধরনের কর্মীদের জন্য অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, জরুরি সহায়তা, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কোনো ভারতীয় শ্রমিক সহিংসতা বা নির্যাতনের শিকার হলে দ্রুত তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে।

গাজা যুদ্ধের প্রভাবও রয়েছে

ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি গাজায় চলমান যুদ্ধকে ঘিরে ভারত সরকারের নীতিও বিভিন্ন মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রাখার অভিযোগে ভারত সরকারকে বিভিন্ন সময়ে অধিকারকর্মীদের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিকের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক বা কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে শ্রমিক অধিকার, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং মানবাধিকার প্রশ্নও জড়িয়ে পড়ছে।

রাজীব আচার্য হত্যাকাণ্ড তাই ইসরায়েলে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। শ্রমিকদের প্রত্যাশা, মামলাটির নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

 


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15668 ,   Print Date & Time: Monday, 24 August 2026, 12:04:49 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh