
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ফ্রিল্যান্সার, ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীদের বৈধ উপায়ে আন্তর্জাতিক বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাদেশে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ জোরদার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে বহির্মুখী বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নীতিমালায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু শিথিলতা আনা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট’ (ডিভিএ)। এই কাঠামোর আওতায় দেশের ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব বা ডিজিটাল ওয়ালেট সুবিধা চালু করতে পারবে।
এর ফলে গ্রাহকেরা স্থানীয় ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা ধারণ ও লেনদেন করতে পারবেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করা বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক আয় দেশে আনার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও আনুষ্ঠানিক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পেপ্যাল আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগাযোগ
দেশের বাজারে কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পেপ্যালের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জবাবে পেপ্যাল জানিয়েছে, তারা বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা পর্যালোচনা করছে।
শুধু পেপ্যাল নয়, দেশের কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকও পেপ্যাল, গুগল ওয়ালেট, ওয়াইজ ও পেওনিয়ারের মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবাদাতাদের সঙ্গে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালার ফলে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবাদাতাদের সঙ্গে দেশের ব্যাংকগুলোর সরাসরি অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের পরিধি আরও বাড়তে পারে।
বড় সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, নতুন নীতিমালার মাধ্যমে বিশাল একটি সম্ভাবনাময় বাজারকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সেবার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন হলেও ফ্রিল্যান্সিং আয়, বিদেশ ভ্রমণ ও অন্যান্য বৈদেশিক ব্যয়ের সম্ভাব্য বাজার ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিদেশ ভ্রমণে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় বৈদেশিক মুদ্রার ইনওয়ার্ড ও আউটওয়ার্ড—উভয় ধরনের লেনদেনের সুযোগ রাখায় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাংলাদেশের বাজার আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক আয় দেশে আনার সুযোগ
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক ফ্রিল্যান্সার বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় আয় করছেন। নতুন ডলার ওয়ালেট কাঠামো কার্যকর হলে এসব আয় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আনার প্রক্রিয়া আরও সহজ হতে পারে।
বিশেষ করে পেওনিয়ার, পেপ্যাল কিংবা ওয়াইজের মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে দেশীয় ব্যাংকের অংশীদারত্ব তৈরি হলে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বৈদেশিক আয় গ্রহণ ও ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।
এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক আয় দেশে আসবে, অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক বা ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
চিকিৎসা ও বিদেশ ভ্রমণেও বাড়ছে সুবিধা
নতুন নীতিগত শিথিলতা শুধু ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নয়। ব্যক্তিগত ও করপোরেট পর্যায়ের বিভিন্ন বৈদেশিক ব্যয়ের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে।
ব্যবসায়িক কার্যক্রম, শিক্ষাসংক্রান্ত ফি, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সেবা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত খরচ পরিশোধে ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণ বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা ১২ হাজার ডলার হলেও চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট শর্তে প্রতিবার সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।
এ ছাড়া স্থানীয় ট্যুর অপারেটরদের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে গ্রাহকদের বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ বিক্রির অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে বিদেশ ভ্রমণের কিছু অনানুষ্ঠানিক লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।
পেপ্যাল চালুর ক্ষেত্রে কী বাধা?
বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর আলোচনা নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, পেপ্যালের বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু না করার পেছনে প্রধান সমস্যা নীতিগত বা প্রযুক্তিগত বাধা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ব্যবসায়িক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী ও বেসিসের সাবেক সভাপতি এ কে এম ফাহিম মাশরুরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে পেপ্যালের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু আইনি জটিলতা সমাধানের উদ্যোগ নিলেও পেপ্যাল নিজস্ব কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে উদীয়মান বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা কিছুটা স্থগিত করে।
পরবর্তীতে বাংলাদেশে পেপ্যালের কার্যক্রম নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়। তবে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কারণে সেই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বড় কোনো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা না থাকায় এখন পেপ্যালের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অংশীদারত্বের সুযোগ খুঁজছে দেশীয় ব্যাংকগুলো
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালার পর সম্ভাব্য সুযোগ নিয়ে কাজ শুরু করেছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও। কয়েকটি ব্যাংক আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ওয়ালেট ও পেমেন্ট সেবাদাতাদের সঙ্গে কী ধরনের পণ্য ও অংশীদারত্ব তৈরি করা যায়, তা পর্যালোচনা করছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের মতে, আন্তর্জাতিক কোনো পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তি করার আগে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, লেনদেন নিষ্পত্তি এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
পেপ্যাল ছাড়াও গুগল ওয়ালেট, গুগল পে, পেওনিয়ার কিংবা ওয়াইজের মতো প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে সম্ভাব্য অংশীদার হতে পারে। তবে প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক কাঠামো ও ঝুঁকি এক নয়। তাই কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কী ধরনের অংশীদারত্ব করা হবে, সেটি ব্যাংকগুলোকেই সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে আসতে পারে বৈদেশিক আয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ‘ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট’ কাঠামো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি হতে পারেন দেশের ফ্রিল্যান্সাররা।
বর্তমানে অনেক ফ্রিল্যান্সার আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে বৈদেশিক আয় গ্রহণ করলেও সেই অর্থ ব্যবস্থাপনা ও দেশে আনার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। নতুন ব্যবস্থায় স্থানীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে বৈদেশিক আয় সরাসরি আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আনা সহজ হতে পারে।
পাশাপাশি বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সুযোগ বাড়বে। ফলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য নতুন এই নীতিগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।