
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) নতুন কার্গো নিয়ে জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর পর মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে আবারও গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে চলমান গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
এলএনজি আমদানি তদারক করে পেট্রোবাংলা। আর আমদানি কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছে পেট্রোবাংলার কোম্পানি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার দুপুর ২টা থেকে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে ঘণ্টায় নয়, বরং দৈনিক প্রায় ১০ কোটি ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়েছে। রাতের দিকে সরবরাহ আরও কিছুটা বাড়তে পারে।
এর আগে দীর্ঘ ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস সংকটের পর গত ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ে। তবে নতুন এলএনজি কার্গো না থাকায় এক্সিলারেটের টার্মিনালের মজুত ধীরে ধীরে কমে যায়। একপর্যায়ে গত বুধবার বিকেল থেকে সেখানকার গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন জাহাজ পৌঁছানোর পর শনিবার আবারও টার্মিনালে থাকা এলএনজি থেকে সরবরাহ শুরু হয়েছে। রাতেই নতুন কার্গো থেকে টার্মিনালে এলএনজি খালাস করার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন প্রায় নয় বছর ধরে কমছে। এই ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি দেশীয় কোম্পানি সামিটের।
গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি পুনরায় এলএনজি সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হলেও নতুন কার্গো না আসায় সীমিত পরিমাণে পুরোনো মজুত থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এক্সিলারেটের সরবরাহ বন্ধ থাকায় সামিটের টার্মিনাল থেকেও সক্ষমতার তুলনায় বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। তবে এলএনজি সংকটের কারণে মাঝখানে সামিটের সরবরাহও বন্ধ রাখতে হয়।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। বাকি গ্যাস আসে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে।
তবে গত এক মাস ধরে এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতার তুলনায় গড়ে প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ছিল। শনিবার দুপুর ১২টায় এলএনজি থেকে সরবরাহ ছিল প্রায় ৫৮ কোটি ঘনফুট। বিকেলে তা বেড়ে ৬৮ কোটি ঘনফুটে পৌঁছায়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৩০ কোটি ঘনফুট হয়েছে। রাতে এলএনজি সরবরাহ ৭৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হলে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৩৭ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী কয়েক দিনও প্রায় একই মাত্রায় গ্যাস সরবরাহ হতে পারে। ফলে সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও দেশের মোট চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থেকেই যাবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাহিদা পূরণে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
এলএনজি সংকটের পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে কম দামে এলএনজি কেনার জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কয়েকটি কার্গোর ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। আগস্টে চারটি কার্গো আসার কথা থাকলেও সেগুলোর কোনোটিই সময়মতো আসেনি। ফলে টার্মিনাল প্রস্তুত থাকার পরও পর্যাপ্ত এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে দরপত্রের মাধ্যমে চলতি মাসের জন্য দুটি এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি কার্গো শনিবার দুপুরে দেশে পৌঁছেছে এবং রাতেই সেটি থেকে টার্মিনালে এলএনজি খালাসের কথা রয়েছে। অন্য কার্গোটি আগামী ২৬ বা ২৭ আগস্ট দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
নতুন কার্গো আসায় গ্যাস সরবরাহে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও দেশে দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতি একেবারে দূর হচ্ছে না। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় আগামী কয়েক দিনও শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে গ্যাস ব্যবহারে সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।