
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চলমান সংকট এক দিনে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার এই সংকট তৈরি করেনি; বরং আগের সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে সংকট কাটাতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সম্পদ কাজে লাগাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে মজুতের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ১৭ দিনের মজুতও ছিল না। বর্তমানে সেই মজুত এক মাসে উন্নীত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি খাতে তিন মাসের মজুত গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সব বিষয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই শিল্প ও ব্যবসা খাতকে পরিকল্পনা করতে হবে।
জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এর প্রভাব ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের ওপরও পড়ছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল ও গ্রেস পিরিয়ডসহ একটি বিশেষ প্যাকেজ দিয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। আমির খসরু বলেন, কোনো ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে থাকলেও বাস্তবে যদি তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে শুধু কাগজে ঋণ দেখিয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই। ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করে প্রকৃত তারল্য তৈরি করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্যাকেজ আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। যোগ্য হওয়ার পরও কোনো ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেলে বিষয়টি সরকারকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান আমির খসরু। তবে অতীতে এ ধরনের অর্থায়নে অনিয়ম ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি।
এবার কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ রাখা হবে না জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদেরই ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিতে হবে। আর্থিক খাতকে বাজারের নিয়মে পরিচালনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
সেমিনারে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ, মুদ্রানীতি, ব্যাংকিং খাত এবং বেসরকারি খাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও আলোচনা হয়।
সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা কঠিন। এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৪ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাস্তব আদায়ের তুলনায় এ লক্ষ্য অর্জনে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ শতাংশ। উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের মতো হওয়ায় বিনিয়োগে বড় বাধা তৈরি হচ্ছে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান রাজস্ব আদায় বাড়াতে ডিজিটালাইজেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কিউআর কোডের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি বেসরকারি খাত। ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের উচিত কার্যকর নীতিকাঠামো তৈরি করা। রপ্তানি বহুমুখীকরণে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতকে এগিয়ে নিতে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর আহ্বান জানান। বিভিন্ন অনুমোদন, সার্টিফিকেশন ও সরকারি দপ্তরের কাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার ওপর নির্ভর করলে চলবে না; দ্রুত সংস্কার ও বিনিয়োগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আনতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সেমিনারে আলোচকরা মনে করেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের উন্নতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরানো সম্ভব হবে।