
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক সময়ে ফসলের রোগ বা পোকা দমনের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভারতে প্রতি বছর পোকার আক্রমণে প্রায় ৩৫% ফসল নষ্ট হয়। এই সমস্যার সমাধানে ভারতের ওড়িশা রাজ্য সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটাবেজ-ভিত্তিক দুটি সেবা চালু করেছে। এগুলো হলো কৃষি সমৃদ্ধি হেল্পলাইন (KSH) এবং কৃষি সমীক্ষা কেন্দ্র (KSK)। এই প্রযুক্তিগুলোর সমন্বয়ে ওড়িশার লাখ লাখ প্রান্তিক কৃষক তাদের ফসল ও জীবিকা রক্ষা করছেন।
ওড়িশার একজন সাধারণ কৃষক শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রধান। করোনা মহামারীর সময়ে তিনি গাঁদা ফুল চাষ শুরু করেন। প্রথমবার ১০,০০০ রুপি লাভ করার পর তিনি বেগুন, শসা এবং পেঁপের মতো লাভজনক ফসল চাষের দিকে মনোযোগ দেন। কিন্তু হঠাৎ এক মৌসুমে তার ক্ষেতে পোকার আক্রমণ ঘটে। পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে হলে সাধারণত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হয়।
পূর্বে কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পেতে শ্রদ্ধাঞ্জলিকে পুরো একদিন ব্যয় করে দূরবর্তী কৃষি অফিসে যেতে হতো। এতে একদিকে যেমন যাতায়াত খরচ বাড়ত, অন্যদিকে সময় নষ্ট হওয়ার কারণে ফসলের বড় ক্ষতি হয়ে যেত। কিন্তু ওড়িশার নতুন কৃষি তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
ফ্রি হেল্পলাইন (KSH): কৃষকরা পোকার আক্রমণ বা ফসলের কোনো সমস্যা দেখলেই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই হেল্পলাইনে কল করতে পারেন।
স্মার্ট ডেটাবেজ (KSK): এটি ওড়িশার প্রথম কেন্দ্রীয় কৃষি মনিটরিং সিস্টেম। এখানে প্রতিটি কৃষকের মাটির গুণাগুণ, ফসলের ধরন এবং স্থানীয় আবহাওয়ার তথ্য আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকে।
দ্রুত সমাধান: হেল্পলাইনের প্রতিনিধি ডেটাবেজ থেকে তথ্য নিয়ে সরাসরি কৃষি বিশেষজ্ঞরা কাছে পাঠান। বিশেষজ্ঞরা দ্রুত কৃষকের নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
মোবাইল অ্যালার্ট: এই সেন্ট্রাল ডেটাবেজের মাধ্যমে কৃষকদের মোবাইলে আবহাওয়া এবং পোকার আক্রমণের আগাম সতর্কবার্তা ও ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়।
ওড়িশা সরকারের এই সমন্বিত কৃষি উদ্যোগের ফলে মাঠ পর্যায়ে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে:
৯৪% হ্রাস: প্রযুক্তিগত সহায়তার ফলে পোকা-আক্রান্ত জমির পরিমাণ ৯৪% কমে গেছে।
২১% ফসল রক্ষা: আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ফসলের সামগ্রিক ক্ষতি প্রায় ২১% হ্রাস পেয়েছে।
৮০ লাখের বেশি উপকৃত: ওড়িশার ৮০ লাখেরও বেশি কৃষক এই ডিজিটাল কৃষি সেবা থেকে সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। ওড়িশার এই সেন্ট্রালাইজড ডেটাবেজ মডেলটি বাংলাদেশের এগ্রো-টেক (Agro-Tech) স্টার্টআপ এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি দারুণ রোডম্যাপ হতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমানে এই ধরনের বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ কাজ করছে।
বৈশিষ্ট্য/সেবাওড়িশা মডেল (KSH & KSK)বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট (বর্তমান উদ্যোগসমূহ)কেন্দ্রীয় ডেটাবেজভারতের প্রথম সেন্ট্রাল এগ্রিকালচারাল মনিটরিং সিস্টেম (KSK)বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় ২.২ কোটি কৃষক পরিবারের জন্য কৃষক স্মার্ট কার্ড (KSC) প্রকল্প চালু হচ্ছে।জরুরি হেল্পলাইনসম্পূর্ণ ফ্রি কৃষি সমৃদ্ধি হেল্পলাইন (KSH)কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS) এর অধীনে পরিচালিত ১৬১২৩ কৃষি কল সেন্টার। ধান চাষের জন্য BRRI-এর ২৪/৭ ধানের হেল্পলাইন (০৯৬৪৪৩০০৩০০)।স্মার্ট মনিটরিংএআই ও রিয়েল-টাইম ওয়েদার/পোকা ট্র্যাকিংডিজিটাল ভিলেজ সেন্টার ও বিভিন্ন এগ্রো-টেক স্টার্টআপের মোবাইল অ্যাপস।
বাংলাদেশে আইফার্মার (iFarmer), কৃষিকানেক্ট (KrishiConnect) কিংবা সরকারি ডিজিটাল ভিলেজ সেন্টার গুলোর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি বাজারের সাথে যুক্ত করা এবং পরামর্শ দেওয়ার কাজ চলছে। তবে ওড়িশার মতো শতভাগ ডেটা-চালিত এবং তাৎক্ষণিক পোকা শনাক্তকরণ ও সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার বাংলাদেশে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকদের রিয়েল-টাইম তথ্য, আধুনিক প্রিসিশন এগ্রিকালচার এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিতে পারলে বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষকদেরও ফসলের ক্ষতি কমিয়ে লাভজনক ব্যবসার মুখ দেখানো সম্ভব। এটি বাংলাদেশী তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার বাজার।