• হোম > ওমেন এন্টারপ্রেনার | কৃষি | বিদেশ > এক কলেই বদলে যাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য: প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ওড়িশার নারী উদ্যোক্তা শ্রধাঞ্জলির বাজিমাত

এক কলেই বদলে যাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য: প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ওড়িশার নারী উদ্যোক্তা শ্রধাঞ্জলির বাজিমাত

  • শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৩৩
  • ২১

---

বিশেষ ফিচার:

কৃষিতে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের ১০ ফোঁড় কাটায়। এক ঋতুর কষ্টার্জিত ফসল সামান্য পোকা কিংবা রোগের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেলে একজন কৃষকের শুধুই যে আর্থিক ক্ষতি হয় তা নয়, থমকে যায় একটি পুরো পরিবারের স্বপ্ন। ভারতের ওড়িশা রাজ্যের কৃষক শ্রধাঞ্জলি প্রধানের জীবনগল্পও একসময় এমন অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল। ফসল নষ্ট হওয়ায় মেয়ের স্কুলের বেতন দিতে হিমশিম খাওয়া সেই শ্রধাঞ্জলি আজ শুধুই একজন সফল কৃষক নন, নিজের দূরদর্শিতা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে পুরো গ্রামের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন।

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে ডিজিটাল রূপান্তর উদ্যোক্তা হিসেবে শ্রধাঞ্জলির ঘুরে দাঁড়ানোর নেপথ্যে কাজ করেছে ওড়িশা সরকারের কৃষি বিভাগের নিখরচায় হেল্পলাইন ‘কৃষি সমৃদ্ধি হেল্পলাইন’ (KSH - 155333)। ফসলে সামান্য পোকার আক্রমণ বা রোগের লক্ষণ দেখা মাত্রই তিনি ফোনে যোগাযোগ করেন এই সেন্টারে। সেন্টারের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে শ্রধাঞ্জলির জমির পরিমাণ, মাটির ধরণ ও ফসলের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকায় কৃষি বিজ্ঞানীরা দ্রুততম সময়ে তার সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান বাতলে দেন।

যেখানে আগে উত্তর পেতে দিন পার হয়ে যেত, সেখানে এই ডিজিটাল সার্ভিসের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি বিশেষজ্ঞ পরামর্শ মিলছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই হেল্পলাইনের সহায়তায় ওড়িশায় প্রায় ৭৯ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন এবং প্রধান কীট-পতঙ্গের উপদ্রব কমেছে প্রায় ৯৪ শতাংশ, যা ফসলের বড় ধরণের ক্ষতি ২১ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে এনেছে।

একজনের তথ্য, পুরো গ্রামের লাভ শ্রধাঞ্জলি একা সফল হয়েই থেমে থাকেননি; তিনি হয়ে উঠেছেন একজন সমাজ সংস্কারক ও তথ্য-উদ্যোক্তা। হেল্পলাইন থেকে প্রাপ্ত সমাধান তিনি নিজের জমিতে প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত হন না, দ্রুত তা ছড়িয়ে দেন আশেপাশের কৃষক ও প্রবীণদের মাঝে, যারা স্মার্টফোন ব্যবহারে পারদর্শী নন। ফলে একটিমাত্র ফোন কলে রক্ষা পাচ্ছে পুরো গ্রামের একর পর একর ফসলি জমি।

করোনাকালে পরিবারের হাল ধরতে গাদা ফুল চাষ দিয়ে যাত্রা শুরু করা শ্রধাঞ্জলি প্রথম মৌসুমেই ১০,০০০ রুপি মুনাফা করেন, যা ভারতের একজন সাধারণ কৃষকের গড় মাসিক আয়ের দ্বিগুণ। এরপর তিনি বেগুন, শসা ও পেঁপে চাষে হাত দেন এবং সফলতার মুখ দেখেন।

নারী ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক কৃষিভিত্তিক সমাজগঠনে নারীদের একতাবদ্ধ করতে শ্রধাঞ্জলি গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG), যেখানে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। একই গ্রামের রঞ্জুক্তা মহারানাকে সাথে নিয়ে এই গোষ্ঠীর মাধ্যমে তারা গড়ে তুলেছেন যৌথ অর্থনৈতিক মডেল।

নারী উদ্যোক্তাদের এই দল সম্মিলিত তহবিল থেকে শস্য গুঁড়ো করার মেশিন, পাওয়ার টিলার, ঘাস কাটার যন্ত্র ও স্প্রেয়ার কিনেছেন। নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব যন্ত্রপাতি তারা অন্যান্য কৃষকদের কাছে ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয় করছেন। পাশাপাশি, ছাতুয়া (পুষ্টিকর শস্যের গুঁড়ো) তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছেন, যা স্থানীয় পুষ্টি চাহিদা মেটানোর সাথে সাথে নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলছে।

ডিজিটাল কৃষি ও টেকসই ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি কীভাবে প্রান্তিক কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে এবং তাদের পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়, ওড়িশার এই মডেল তারই এক অনন্য উদাহরণ। শুধু ফসল উৎপাদনই নয়, শ্রধাঞ্জলি ও তার স্বনির্ভর দলের সদস্যরা এখন গ্রামের শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্কুলের পোশাক সেলাই করে বিতরণ করার মতো সামাজিক কাজেও অংশ নিচ্ছেন।

কৃষিতে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যের যোগান এবং স্থানীয় নেতৃত্বের এমন সমন্বিত উদ্যোগ এশিয়ার অন্যান্য দেশের উদীয়মান কৃষি-উদ্যোক্তাদের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ক ফ্রেমওয়ার্ক হতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15612 ,   Print Date & Time: Saturday, 22 August 2026, 01:24:34 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh