• হোম > বিদেশ | স্বাস্থ্য > ক্যান্সার চিকিৎসায় বড় অগ্রগতি, পরীক্ষায় সফল এমআরএনএ টিকা

ক্যান্সার চিকিৎসায় বড় অগ্রগতি, পরীক্ষায় সফল এমআরএনএ টিকা

  • বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৪৫
  • ৩২

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে মার্ক ও মডার্নার যৌথভাবে তৈরি ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ টিকা। প্রাণঘাতী ত্বকের ক্যান্সার মেলানোমা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের পর রোগটি পুনরায় ফিরে আসা এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে পরীক্ষামূলক এই চিকিৎসা কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি।

মার্ক ও মডার্না বুধবার জানিয়েছে, এক হাজারের বেশি উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা রোগীকে নিয়ে পরিচালিত শেষ ধাপের পরীক্ষায় টিকাটি প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের টিউমার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছিল। এরপরও তাদের শরীরে ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি ছিল বেশি।

এই পরীক্ষায় ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ টিকার পাশাপাশি মার্কের বহুল ব্যবহৃত ইমিউনোথেরাপি ওষুধ কিট্রুডা ব্যবহার করা হয়। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, শুধু কিট্রুডা গ্রহণকারী রোগীদের তুলনায় টিকা ও কিট্রুডার সমন্বিত চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ক্যান্সার ফিরে আসতে বা শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লেগেছে।

তবে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। চিকিৎসাটি রোগীদের সামগ্রিক আয়ু কতটা বাড়াতে সক্ষম হবে, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে এবং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

কীভাবে কাজ করে এই ব্যক্তিভিত্তিক টিকা

‘ইনটিসমেরান অটোজিন’ নামের এই টিকা প্রচলিত অর্থে সুস্থ মানুষকে ক্যান্সার থেকে রক্ষার প্রতিরোধী টিকা নয়। বরং এটি ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রতিটি রোগীর টিউমারের নিজস্ব জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে আলাদাভাবে তৈরি করা একটি চিকিৎসা।

এ চিকিৎসা তৈরির জন্য প্রথমে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা টিউমারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর নমুনাটির ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ক্যান্সার কোষে থাকা নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন চিহ্নিত করা হয়। একটি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে কার্যকর লক্ষ্যগুলো নির্বাচন করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রোগীর জন্য আলাদা এমআরএনএ টিকা প্রস্তুত করা হয়।

টিকাটিতে সর্বোচ্চ ৩৪টি নিওঅ্যান্টিজেনের নির্দেশনা থাকতে পারে। এসব নিওঅ্যান্টিজেন ক্যান্সার কোষের জিনগত পরিবর্তনের কারণে তৈরি অস্বাভাবিক প্রোটিন। টিকা দেওয়ার পর এমআরএনএ শরীরের কোষকে এসব নিওঅ্যান্টিজেনের প্রতিরূপ তৈরি করতে নির্দেশ দেয়। এর ফলে টি-সেলসহ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ ক্যান্সার কোষকে শনাক্ত ও আক্রমণ করতে শেখে।

অন্যদিকে কিট্রুডা বা পেমব্রোলিজুম্যাব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর ক্যান্সার কোষের তৈরি একটি ‘ব্রেক’ সরিয়ে দেয়। ফলে ব্যক্তিভিত্তিক টিকা যেখানে ক্যান্সারের নির্দিষ্ট লক্ষ্য শনাক্ত করতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেয়, কিট্রুডা সেখানে সেই ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে আক্রমণের সুযোগ বাড়ায়।

আগের গবেষণাতেও মিলেছিল আশাব্যঞ্জক ফল

এর আগে ১৫৭ জন উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা রোগীকে নিয়ে পরিচালিত মধ্যবর্তী পর্যায়ের পরীক্ষার পাঁচ বছরের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে শুধু কিট্রুডার তুলনায় টিকা ও কিট্রুডার সমন্বিত চিকিৎসায় ক্যান্সার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ কমেছিল। একই সঙ্গে ক্যান্সার শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি কমেছিল ৫৯ শতাংশ।

তবে এসব সংখ্যা আপেক্ষিক ঝুঁকি হ্রাসের হিসাব। অর্থাৎ এগুলোকে সরাসরি প্রতি ১০০ রোগীর মধ্যে কতজন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন—এভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

গবেষকদের মতে, নতুন পরীক্ষার ফলাফল ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ম্যাস জেনারেল ব্রিগহাম ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর মেলানোমার পরিচালক ডা. রায়ান সুলিভান ফলাফলটিকে সামগ্রিক ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. জুলি গ্র্যালোও ফলাফলটিকে এমআরএনএ প্রযুক্তিকে ক্যান্সার চিকিৎসায় প্রতিষ্ঠার পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তবে অন্যান্য ধরনের ক্যান্সারে একই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যান্য ক্যান্সারেও চলছে পরীক্ষা

মেলানোমার পাশাপাশি ফুসফুস, মূত্রাশয়, কিডনি, অগ্ন্যাশয় ও পাকস্থলীর ক্যান্সার নিয়েও ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে।

মার্ক ও মডার্না অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা নন-স্মল সেল ফুসফুসের ক্যান্সারে কয়েকটি বড় পরীক্ষা পরিচালনা করছে। মূত্রাশয় ও কিডনি ক্যান্সারে মধ্যবর্তী পর্যায়ের এবং অগ্ন্যাশয় ও পাকস্থলীর ক্যান্সারে প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষাও চলছে।

এদিকে রোশ ও বায়োএনটেকও ‘অটোজিন সেভুমেরান’ নামে একই ধরনের ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ চিকিৎসা নিয়ে কাজ করছে। কোলন ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার রোগীদের ওপর এর পরীক্ষা চলছে।

চিকিৎসার ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা

মার্ক ও মডার্নার তথ্য অনুযায়ী, টিকা যুক্ত করার পর নতুন কোনো নিরাপত্তাজনিত সংকেত পাওয়া যায়নি। আগের পরীক্ষায় টিকার সঙ্গে সম্পর্কিত সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে ছিল ক্লান্তি, ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা ও কাঁপুনি।

তবে কিট্রুডার কারণে ক্লান্তি, ডায়রিয়া, ত্বকে ফুসকুড়ি এবং অস্থিসন্ধি ও পেশিতে প্রদাহের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত সক্রিয়তার কারণে শরীরের সুস্থ অঙ্গেও গুরুতর প্রদাহ তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইনটিসমেরান অটোজিন এখনো একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার আগে এটি সাধারণ রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া চিকিৎসাটির সম্ভাব্য মূল্য, রোগীর টিউমার বিশ্লেষণ থেকে ব্যক্তিভিত্তিক টিকা তৈরিতে প্রয়োজনীয় সময় এবং বিভিন্ন দেশে এ প্রযুক্তি সহজলভ্য করার বিষয়েও এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি।

তবে মেলানোমার বড় পরীক্ষায় পাওয়া ইতিবাচক ফল ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ প্রযুক্তিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। গবেষণা সফলভাবে এগোলে ভবিষ্যতে রোগীর নিজস্ব ক্যান্সারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি টিকা ক্যান্সার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

 

 


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15604 ,   Print Date & Time: Friday, 21 August 2026, 04:33:07 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh