• হোম > দেশজুড়ে > গ্যাস সংকটে গাজীপুরের শিল্প, ঝুঁকিতে রপ্তানি

গ্যাস সংকটে গাজীপুরের শিল্প, ঝুঁকিতে রপ্তানি

  • বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫৯
  • ৮

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটে ব্যাহত হচ্ছে কারখানার উৎপাদন। প্রয়োজনীয় চাপের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অনেক কম থাকায় অনেক কারখানায় মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। উৎপাদন সচল রাখতে কোথাও ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কোথাও যন্ত্রের পরিবর্তে হাতে কাজ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিও বাড়বে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হচ্ছে, বাড়ছে বিমান পরিবহনের খরচও।

গাজীপুরের স্প্যারো অ্যাপারেলস লিমিটেডে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ডেনিম প্রেসিংয়ের মেশিন ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ হাতে করতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক শাওন ইসলাম জানান, স্বাভাবিক গ্যাসচাপ থাকলে মেশিনে দ্রুত ডেনিম ও ফিনিশিংয়ের কাজ করা সম্ভব হলেও বর্তমানে ম্যানুয়ালি কাজ করতে হওয়ায় উৎপাদনের গতি কমে যাচ্ছে।

প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকের কাছাকাছি গ্যাস সরবরাহ

শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি নিবন্ধিত রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৪০০টির বেশি কারখানা গ্যাসের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। টেক্সটাইল, ডাইং, ফিনিশিং, ডেনিম, নিটিং ও ওভেন ইউনিট চালাতে সাধারণত ৭ থেকে ৮ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হলেও অনেক কারখানায় তা ২ পিএসআইয়ের নিচে নেমে গেছে। কোনো কোনো কারখানায় চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছিও দেখা গেছে।

শিল্প খাতে প্রতিদিন প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ মিলছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ।

টঙ্গী বিসিক, গাছা, বাসন, কোনাবাড়ী বিসিক, কাশিমপুর, গাজীপুর সদর, সফিপুর, কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ও শ্রীপুরসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় এই সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে।

বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। আবার কিছু গ্যাসনির্ভর ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

ডিভাইন গ্রুপের ডাইং কার্যক্রম এবং সাদমা গ্রুপের একটি টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালু রেখেছে, তারাও পূর্ণ সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, তৈরি পোশাক কারখানা সরাসরি বিদ্যুতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হলেও স্পিনিং, ডাইং, নিটিং ও ফিনিশিংয়ের মতো ব্যাকওয়ার্ড-লিংকেজ শিল্প গ্যাসনির্ভর। এসব খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে পুরো রপ্তানি সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে।

বিজিএমইএর সদস্য কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম উৎপাদন করছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। পাশাপাশি উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা চালু করায় ব্যয় আরও বাড়ছে।

রপ্তানি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

গ্যাস সংকটের কারণে শুধু উৎপাদন নয়, রপ্তানি পণ্য সময়মতো পাঠানো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পাঠাতে না পারলে ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো রপ্তানিকারক দ্রুত পণ্য পাঠাতে বিমান পরিবহনের আশ্রয় নিচ্ছেন, এতে অতিরিক্ত বড় অঙ্কের খরচ হচ্ছে।

সাদমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন বলেন, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর ও ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায়ই ১ পিএসআই বা তার নিচে নেমে যাচ্ছে। অথচ কারখানা সচল রাখতে অন্তত ৫ থেকে ৬ পিএসআই চাপ প্রয়োজন।

তিনি জানান, তার দুটি কারখানায় প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক বসে আছেন। একটি কারখানা ডিজেল দিয়ে চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও টেক্সটাইল কারখানাটি বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন না থাকলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর শঙ্কা

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সীমা বারবার পিছিয়ে গেলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশীয় কাপড় ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে সাধারণত লিড টাইম প্রায় ৭০ দিন। আমদানি করা কাপড়ের ক্ষেত্রে তা ৯১ দিন পর্যন্ত হতে পারে। এর সঙ্গে স্থলপথে কাপড় আমদানি বন্ধ থাকা ও কনটেইনার সংকট যুক্ত হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হয়েছে।

শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘ হলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি কিছু ইউনিট বন্ধ হতে পারে। এতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তিতাস গ্যাসের এক কর্মকর্তা গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাস ঘাটতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিতাস গ্যাসের গাজীপুর বিক্রয় বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক সুরুজ আলম জানিয়েছেন, কোনো কারখানা মালিক আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য জানাননি।

গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইনও জানিয়েছেন, কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো প্রতিবেদন আসেনি। তবে বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে বলে তিনি জানান।

সব মিলিয়ে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে চলমান গ্যাস সংকট শুধু উৎপাদন ব্যাহত করছে না, একই সঙ্গে বাড়িয়ে দিচ্ছে শিল্পের পরিচালন ব্যয়, রপ্তানি ঝুঁকি ও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর আশঙ্কা। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এর প্রভাব দেশের তৈরি পোশাক ও সংশ্লিষ্ট রপ্তানি খাতেও আরও বিস্তৃত হতে পারে।

 

 


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15576 ,   Print Date & Time: Thursday, 20 August 2026, 12:03:04 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh