
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। সফরটি হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘সম্মানজনক অভ্যর্থনা’ দেওয়ার বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে। এতে দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নয়াদিল্লির আগ্রহের ইঙ্গিত মিলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এখনো সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। বড় কোনো জটিলতা তৈরি না হলে আগস্টের শেষ সপ্তাহে তারেক রহমানের ভারত সফর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় পক্ষই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজনের চেষ্টা করছে। নয়াদিল্লি সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকের ওপর নির্ভর না করে আগস্টেই দুই নেতার বৈঠক আয়োজন করতে আগ্রহী বলে জানা গেছে।
দ্বিপক্ষীয় সফরেই বেশি গুরুত্ব ঢাকার
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঢাকায় কর্মরত কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিকও সফর নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। এর পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন।
সফর আগস্টে সম্ভব না হলেও সেপ্টেম্বর বা পরবর্তী সময়ে ভারত যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
দুই দেশের কর্মকর্তাদের ধারণা, তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির সরাসরি বৈঠক হলে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ককে আরও গঠনমূলক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পথও খুলতে পারে।
‘সম্মানজনক অভ্যর্থনার’ বার্তা
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের শিল্প সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। সফরকালে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয় গুরুত্ব পায়।
১৮ আগস্ট ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নেতা ও সফররত ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সদস্যরা অংশ নেন। সেখানে ভারতীয় নেতা দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের শীর্ষ নেতার সরাসরি বৈঠকের বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বহুপক্ষীয় বৈঠকের তুলনায় দ্বিপক্ষীয় সফরে দুই নেতার সরাসরি আলোচনার সুযোগ বেশি থাকে। আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা, নৈশভোজ ও বৈঠকের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র নির্ধারণ এবং যৌথ বিবৃতি দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, অতীতের বিরোধে আটকে না থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের নতুন ও ইতিবাচক অধ্যায় শুরু করা প্রয়োজন। তারেক রহমান ভারত সফর করবেন কি না—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও তিনি সফরটি দ্রুত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও গুরুত্ব
সম্ভাব্য সফরকে কেন্দ্র করে শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ বাড়লে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হলে এসব বিষয়ে নতুন করে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গঙ্গার পানি বণ্টনসহ অমীমাংসিত বিষয়ে আলোচনা
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আলোচনায় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি হয়। এর মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে ঢাকা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে চুক্তি নবায়ন বা আরও কার্যকর কাঠামো তৈরির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া সম্ভাব্য বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি, সীমান্তে প্রাণহানি, কথিত পুশ-ইন, বাণিজ্য, জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া
তবে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের মতৈক্য নেই। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সফরের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান জানিয়েছেন।
১৪ আগস্ট ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ভারত শেখ হাসিনা এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর করা উচিত নয়।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, ভারতের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার ভিত্তিতে তারেক রহমান সফর করলে বিএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তিনি শেখ হাসিনার দিল্লিতে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সফরের পরিবেশ তৈরি করতে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ চলছে।
১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম জানান, তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ চলছে। তবে এখনো সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি।
সম্পর্কের টানাপোড়েন কমানোর সুযোগ
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি এবং দিল্লিতে তার বিভিন্ন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে রাজনৈতিক উত্তেজনাও দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অনেকে। তাদের মতে, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি বৈঠক হলে রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পর তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে দেখতে হবে। তার মতে, পারস্পরিক সম্মান, আস্থা, মর্যাদা ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও মনে করেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ও বাংলাদেশি নাগরিকদের কথিত পুশ-ইনসহ বিভিন্ন ঘটনায় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতের বিষয়ে সংবেদনশীলতা বেড়েছে। এসব বিষয় সমাধানে উভয় পক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
নতুন সম্পর্কের সম্ভাবনা
ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস ও পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ ও ভারত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন কমানো উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর সফল হলে পানি বণ্টন, বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ বাড়লে সাম্প্রতিক উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখন মূল অপেক্ষা সফরের আনুষ্ঠানিক তারিখ ঘোষণার। আগস্টের শেষ সপ্তাহে সফরটি হলে তা ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।