
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবিকে যুক্ত করার সমালোচনা করেছেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক অবস্থানকে তিনি ‘অত্যন্ত রূঢ়’ ও ‘অহংকারী’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বীণা সিক্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা বিস্ময়কর। তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিতে অনভিপ্রেত।
বীণা সিক্রির ভাষ্য, এ ধরনের অবস্থান থেকে মনে হতে পারে যে ঢাকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। তিনি মনে করিয়ে দেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন
সাবেক এই কূটনীতিকের দাবি, তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের পক্ষ থেকে তাকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলেও দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আমন্ত্রণের জবাব দেয়নি। পরে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্যও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বীণা সিক্রি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সফর আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট প্রস্তুতি ও সময় প্রয়োজন হয়। সেই প্রক্রিয়ার পরিবর্তে কোনো একটি প্রত্যর্পণ ইস্যুকে সফরের শর্ত হিসেবে সামনে আনা কূটনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
‘প্রত্যর্পণ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া’
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে বীণা সিক্রি বলেন, প্রত্যর্পণ একটি দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া। এটি সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে একটি রাজনৈতিক সফরের সঙ্গে এমন একটি আইনি প্রক্রিয়াকে সরাসরি শর্ত হিসেবে যুক্ত করা কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তার মতে, দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পথ খোঁজা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ঢাকার অবস্থান
এর আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের পরিবেশ তৈরিতে শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছিল, দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক একটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্ক ও সম্ভাব্য সফরের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে।
তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। এটি একটি বেসরকারি মিডিয়া আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল বলে দিল্লির পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ও টানাপোড়েন চলছে।
সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এর পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি জোরালো করে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। একই সঙ্গে শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তরের দাবিও জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে এখনো সফরের কোনো চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং দুই দেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় এখন পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।