• হোম > অর্থনীতি > মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

  • বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৭:১১
  • ৮৭

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে জ্বালানি, পরিবহন ও ইউটিলিটি সেবা—জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও বাজারে তার বাস্তব প্রভাব থেকে স্বস্তি পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে।

সরকারি বিক্রয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খুচরা মূল্য সংগ্রহ করে। সংস্থাটির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে, আবার কিছু পণ্যের দাম প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

ফলে মূল্যস্ফীতির হার কমার পরিসংখ্যান থাকলেও সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেটে তার প্রতিফলন খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। বরং খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহনসহ খাদ্য-বহির্ভূত ব্যয়ের চাপও পরিবারগুলোর মাসিক খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি নেই

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও তা দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গত মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে।

তবে মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ এই নয় যে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। বরং আগের উচ্চমূল্যের ওপর নতুন করে দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে কয়েক মাস আগের তুলনায় অনেক পণ্য এখনও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় রমজান ও ঈদকেন্দ্রিক বাড়তি চাহিদা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে কিছু পণ্যে শুল্ক ছাড় এবং নতুন মৌসুমি পণ্যের সরবরাহ বাড়ায় মূল্যস্ফীতির হার কমেছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে সেই স্বস্তির হিসাব মিলছে না ভোক্তাদের।

ছয় মাসে বেড়েছে বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম

টিসিবির বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মোটা ও সরু চালের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। মাঝারি মানের চালের দাম কিছুটা কমেছে।

তবে ভোজ্যতেল, লবণ, আটা, ডাল, আলু, রসুন, ডিম ও গুঁড়া দুধসহ বেশ কিছু খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। একই সময়ে মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ধরনের কাঁচা সবজির দামও বেড়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাবার কিনতেই ব্যয় হয়, তাদের জন্য খাদ্যপণ্যের সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও মাসিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি করছে।

অন্যদিকে, খাদ্যপণ্যের বাইরে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও অন্যান্য সেবার ব্যয় বাড়ায় পরিবারের অন্যান্য খাতেও খরচ বেড়েছে। ফলে আয় একই থাকলেও মাস শেষে হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

ডলারের দামে বেড়েছে আমদানি ব্যয়

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে দীর্ঘদিনের বৈদেশিক মুদ্রার সংকটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রতি ডলারে আমদানি ব্যয় প্রায় ৩৭ টাকা বেড়েছে।

আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপছে। একইভাবে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।

উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কারখানা পর্যায় থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে। ফলে শুধু আমদানি করা পণ্য নয়, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অনেক পণ্যের দামও বাড়তে পারে।

জ্বালানি ব্যয় বাড়াচ্ছে নতুন চাপ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি জ্বালানি বাজারেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন এবং বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা সরকারের ব্যয় বাড়িয়েছে।

জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম, পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবার ব্যয়েও এর প্রভাব পড়ে।

ফলে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে ধাপে ধাপে তার প্রভাব পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের কাছে। পরিবহন ভাড়া বাড়ার পাশাপাশি পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের খরচও বেড়ে যায়। এর ফলে পরিবারের মাসিক ব্যয় আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে।

টিসিবির সহায়তা সীমিত পরিসরে

দ্রব্যমূল্যের চাপ সামাল দিতে টিসিবি ভর্তুকি মূল্যে ট্রাকে করে বিভিন্ন নিত্যপণ্য বিক্রি করছে। এতে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। তবে পণ্যের সরবরাহ সীমিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনতে হচ্ছে।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তার সুযোগ তৈরি করছে। তবে এসব কর্মসূচি এখনও পুরোপুরি বিস্তৃত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারের ওপর এর প্রভাব এখনও সীমিত।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে সংকটের কারণ

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমছে না। এর অন্যতম কারণ হলো, অনেক পণ্য ও সেবার দাম আগের তুলনায় এখনও বেশি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ও মুদ্রানীতির মধ্যেও কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়া এবং বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল হওয়ার পরও পণ্যমূল্য কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমেনি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবও বাজারে পড়েছে।

তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আগেই প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সুদহার কমানোসহ সম্প্রসারণমূলক আর্থিক ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনও মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সরকারের বিভিন্ন নীতির মধ্যেও পারস্পরিক অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

কর্মসংস্থান ও আয় না বাড়ায় বাড়ছে চাপ

জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সম্পর্কও সরাসরি জড়িত। অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত হয়েছে।

যখন পরিবারের আয় বাড়ে না, কিন্তু খাবার, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়তে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই পারিবারিক বাজেটে চাপ তৈরি হয়।

এ অবস্থায় অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় পণ্য কম কিনতে, সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা অন্য খাতের ব্যয় কমিয়ে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এমন পরিস্থিতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনমানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

দ্রব্যমূল্য নিয়ে সন্তুষ্ট নন বাণিজ্যমন্ত্রী

বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট নন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদিরও। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন।

তবে তাঁর মতে, শুধু বাজার তদারকি করে পণ্যের দাম কমানো সম্ভব নয়। এর সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য, ঋণের সুদ, উৎপাদনশীলতা, পরিবহন ও অবকাঠামোর মতো বিষয় সরাসরি জড়িত।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় বেশি। পণ্য পরিবহনের খরচ বেশি হওয়ায় তার প্রভাব পণ্যের দামের ওপর পড়ছে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজারে অভিযান বা সাময়িক ভর্তুকি যথেষ্ট নয়। উৎপাদন বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করার মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।

সরকার নতুন এলএনজি অবকাঠামো, গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্থিতিশীলতা আসতে পারে।

তবে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে আসা। মূল্যস্ফীতির হার কমার পরিসংখ্যান তখনই মানুষের জীবনে স্বস্তি আনবে, যখন বাজারে পণ্য কেনার সময় সেই পরিবর্তন বাস্তবে অনুভূত হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানোর দিকে নজর না দিয়ে খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও ইউটিলিটি ব্যয়ের সামগ্রিক চাপ কমানো জরুরি। একই সঙ্গে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকি কর্মসূচির আওতা বাড়াতে পারলে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি এখনও ফেরেনি। খাদ্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয়, আমদানি খরচ, পরিবহন ও ইউটিলিটি ব্যয়ের সম্মিলিত চাপ পরিবারগুলোর বাজেটকে ক্রমেই সংকুচিত করছে। তাই বাজার স্থিতিশীল করার পাশাপাশি উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়ানোর ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15526 ,   Print Date & Time: Thursday, 8 October 2026, 10:20:24 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh