• হোম > দেশজুড়ে > পিংক বাসের স্টিয়ারিংয়ে সিলেটের ফাহিমা

পিংক বাসের স্টিয়ারিংয়ে সিলেটের ফাহিমা

  • বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৩:১৩
  • ৪১

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চালু করা ‘মহিলা বাস সার্ভিসে’ চালকের দায়িত্ব পেয়েছেন সিলেটের ফাহিমা আক্তার। পিংক রঙের বাসের স্টিয়ারিংয়ে বসে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ঢাকার সড়কে নতুন যাত্রা শুরু করেছেন তিনি। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার পর বাসচালকের দায়িত্ব পাওয়া ফাহিমার এই পথচলা নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার বার্তাও দিচ্ছে।

মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকাসহ তিনটি শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে পিংক বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও নয়টি দ্বিতল পিংক বাস চলবে। পাশাপাশি বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলাচল করবে। তিন শহরের মোট ১৩৪টি স্থানে বাসগুলো থামবে। পরবর্তীতে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি রুটও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

দীর্ঘ প্রশিক্ষণের পর বাসের স্টিয়ারিংয়ে ফাহিমা

সিলেট সদর উপজেলার বাসিন্দা ফাহিমা আক্তার। তিনি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে পড়াশোনা করেছেন। ২০১৮ সালে সিলেটের বিআরটিসি কার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেন। প্রথমে হালকা যানবাহন চালানোর প্রশিক্ষণ নিলেও ধীরে ধীরে মিডিয়াম ও হেভি যানবাহন চালানোর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে হেভি লাইসেন্সও অর্জন করেন তিনি।

দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিআরটিসি সিলেটের কার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন ফাহিমা। এবার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ঢাকার ব্যস্ত সড়কে পিংক বাস চালানোর দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।

নতুন দায়িত্বকে নিজের জন্য গর্বের বিষয় হিসেবে দেখছেন ফাহিমা। তার ভাষায়, নিজেকে শুধু ‘মহিলা চালক’ হিসেবে পরিচয় দিতে চান না; বরং এই বাস সার্ভিসের একজন ‘পাইলট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেই তিনি বেশি গর্ববোধ করেন।

তিনি বলেন, এমন একটি চ্যালেঞ্জিং জায়গায়, যেখানে অনেক পুরুষও সাহস করতে চান না, সেখানে একজন নারী হিসেবে শ্রম ও মেধার মাধ্যমে তিনি জায়গা করে নিতে পেরেছেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী বাস সার্ভিসের ইতিহাস রচনার যে সূচনা হচ্ছে, তারাও সেই ইতিহাসের অংশ হতে যাচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকার যানজট ও প্রতিকূলতা সামলানোর প্রস্তুতি

ঢাকার সড়কে বাস চালানো সহজ কাজ নয়। প্রতিদিনের যানজট, বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চাপ এবং নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই একজন চালককে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফাহিমাও এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন।

ঢাকার সড়কে পিংক বাস চালানোর চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাস্তায় যানজট থাকবে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। সব পরিবেশ সবসময় অনুকূলে থাকবে না। তবে এসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই তাদের নতুন যাত্রা শুরু করতে হবে।

নতুন দায়িত্ব পেয়ে আনন্দিত হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বের গুরুত্বও উপলব্ধি করছেন ফাহিমা। যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াকে তিনি নিজের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন।

সহকর্মী চালকদের সহযোগিতা চান ফাহিমা

সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু একজন চালকের সতর্কতা যথেষ্ট নয়। সব ধরনের যানবাহনের চালকের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। তাই অন্যান্য যানবাহনের চালকদের প্রতিও বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন ফাহিমা।

তিনি মনে করেন, সময়ের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। অতিরিক্ত গতি, অতিরিক্ত যাত্রী বহন কিংবা অসতর্কতার কারণে একটি দুর্ঘটনা ঘটলে একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্নার কারণ হতে পারে।

এ কারণে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাসসহ সব ধরনের যানবাহনের চালকদের ধীরে ও সতর্কভাবে গাড়ি চালানোর অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

ফাহিমার প্রত্যাশা, সড়কে অন্য চালকেরা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, একজন সহকর্মী হিসেবে দেখবেন। পিংক বাসের চালকদের সহযোগিতা করলে নারী যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবহনসেবা নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।

যাত্রীদের নিরাপত্তাই প্রথম দায়িত্ব

একজন বাসচালক হিসেবে ফাহিমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাত্রীদের নিরাপত্তা। তার মতে, যাত্রীদের শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাও চালকের দায়িত্বের অংশ।

পিংক বাসে যাত্রীরা যেন স্বস্তির সঙ্গে ভ্রমণ করতে পারেন এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন তিনি।

বিশেষ করে নারীদের জন্য চালু হওয়া এই সেবা নিয়ে যাত্রীদের ভয় বা দ্বিধা না রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ফাহিমা। তার প্রত্যাশা, নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে এই বাসে যাতায়াত করবেন এবং বিআরটিসির নতুন উদ্যোগকে সফল করতে পাশে থাকবেন।

নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে নতুন উদ্যোগ

ঢাকা, বগুড়া ও চট্টগ্রামে একযোগে পিংক বাস সার্ভিস চালুর ফলে নারী যাত্রীদের জন্য গণপরিবহনে নতুন একটি বিকল্প তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যস্ত নগরজীবনে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ঢাকায় ১০টি রুটে পিংক বাস চলাচল শুরু হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নারী যাত্রীরা এই সেবা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে বগুড়া ও চট্টগ্রামেও নির্দিষ্ট রুটে বাস চলবে। ভবিষ্যতে রুট ও বাসের সংখ্যা বাড়ানো হলে এই সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।

এই উদ্যোগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারী চালকদের অংশগ্রহণ। ফাহিমা আক্তারের মতো প্রশিক্ষিত নারী চালকেরা দায়িত্ব পাওয়ায় পরিবহন খাতে নারীদের অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শুধু চাকরি নয়, নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প

ফাহিমা আক্তারের যাত্রা শুধু একজন নারী বাসচালকের নতুন চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, দক্ষতা অর্জন এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি এমন একটি পেশায় জায়গা করে নিয়েছেন, যেখানে নারীর অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলকভাবে কম।

হালকা যানবাহন থেকে শুরু করে মিডিয়াম ও হেভি যানবাহনের প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং পরে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন—সব মিলিয়ে ফাহিমার পেশাগত প্রস্তুতিও ছিল দীর্ঘ। সেই প্রস্তুতির পর এবার রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে পিংক বাসের স্টিয়ারিং হাতে নেওয়া তার ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।

তার এই যাত্রা অন্য নারীদেরও পরিবহন খাতে প্রশিক্ষণ নেওয়া ও পেশা হিসেবে গাড়ি চালানোর বিষয়টি ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকলে নারীরাও চ্যালেঞ্জিং পেশায় সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন—এই বার্তাও সামনে আনছে তার পথচলা।

নিরাপদ সড়কের প্রত্যাশা

পিংক বাস সার্ভিসের মাধ্যমে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে চালক, যাত্রী এবং অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীর সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

ফাহিমা আক্তার সেই সহযোগিতার প্রত্যাশাই করছেন। তার আহ্বান, যাত্রীরা যেন এই নতুন সেবার ওপর আস্থা রাখেন এবং চালকেরা পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সড়কে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করেন।

তার ভাষায়, পিংক বাস নারীদের জন্য চালু হয়েছে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে। তাই ভয় না পেয়ে নারীদের এই বাসে যাতায়াত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। নিজের দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করে যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন ফাহিমা।

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে পিংক বাসের স্টিয়ারিংয়ে ফাহিমা আক্তারের এই যাত্রা তাই শুধু একটি নতুন বাস সার্ভিসের সূচনা নয়; বরং পরিবহন খাতে নারীর অংশগ্রহণ ও সক্ষমতারও একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া ফাহিমার মতো নারীদের হাত ধরেই বাংলাদেশের গণপরিবহনে আরও বেশি নারীর অংশগ্রহণের পথ তৈরি হতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15520 ,   Print Date & Time: Wednesday, 19 August 2026, 12:43:42 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh