
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দৈনিক উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেকই এখন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থায় প্রভাব বাড়ানোর পর এই পরিবর্তন এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে আয়োজিত একটি জ্বালানি শিল্প সম্মেলনে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি কাইল হাউসটভেইট জানান, ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে।
ভেনেজুয়েলার উৎপাদিত তেলের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলের পরিশোধনাগারগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। এসব পরিশোধনাগার ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার উপযোগী করে তৈরি হওয়ায় ভেনেজুয়েলার তেল আমেরিকার জ্বালানি শিল্পের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনে পরিবর্তন
ভেনেজুয়েলার তেল খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেলের মজুদ থাকা সত্ত্বেও দেশটি তার সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম তেল উৎপাদন করেছে।
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ রয়েছে। এটি বিশ্বের মোট প্রমাণিত তেল মজুদের প্রায় ১৭ শতাংশ।
তবে দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে ভেনেজুয়েলার অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০১৫ সালের শেষ দিকে দেশটি দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করলেও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ব্যারেল।
বর্তমানে সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। ভেনেজুয়েলার উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি দেশটির তেল রপ্তানিতেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারী তেলের জন্য বিশেষায়িত মার্কিন পরিশোধনাগার
ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল সাধারণত ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত। এ ধরনের তেল পরিশোধনের জন্য বিশেষ ধরনের প্রযুক্তি ও অবকাঠামো প্রয়োজন হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলের বেশ কিছু পরিশোধনাগার দীর্ঘদিন ধরেই ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার উপযোগী। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব মার্কিন পরিশোধনাগারও সরাসরি লাভবান হচ্ছে।
কাইল হাউসটভেইটের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র শুধু ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানিই করছে না, উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও দেশটিকে সহযোগিতা করছে। ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে মেশানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন ১ লাখ ব্যারেলের বেশি ন্যাপথা দেশটিতে পাঠাচ্ছে।
তিনি দুই দেশের এই জ্বালানি বাণিজ্যকে একটি ‘চমৎকার জ্বালানি অংশীদারিত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছে।
উৎপাদন আরও বাড়াতে চায় কারাকাস
ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারাও দেশটির তেল উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সহসভাপতি জোভানি মার্টিনেজ জানান, আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক ১২ লাখ ৪৫ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে চলতি বছরে তেল রপ্তানি প্রায় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
মার্টিনেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ভেনেজুয়েলায় জ্বালানি উৎপাদন ১২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে অতিরিক্ত ৫ দশমিক ৪ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা জ্বালানি খাতে সংস্কারের চেষ্টা চালিয়েছে এবং এখন সেই উদ্যোগের সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির নিজস্ব শোধনাগার আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে ভারী অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে মেশানোর জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তেল বিক্রির অর্থ কোথায় যাচ্ছে?
ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়লেও তেল বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থা ও দেশটির তেল সম্পদের ব্যবহারের বিষয়ে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণের কথা জানানোর পর থেকেই তেল বিক্রির অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ একটি নির্দিষ্ট হিসাবে জমা হবে এবং ওই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে, তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলা প্রতি মাসে বাজেটের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ব্যবহারের প্রস্তাব দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করবে ওই অর্থ কোন কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
ফলে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ থেকে আয় বাড়লেও দেশটির নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন মেটাতে সেই অর্থ কতটা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তেল বিক্রি থেকে বড় রাজস্বের দাবি
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, চলতি বছর ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করেছে।
ওই প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় ২৭ জুলাই ট্রাম্প দাবি করেন, প্রকৃত অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ আরও বেশি। তবে এই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে গত এপ্রিলে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার জন্য আনুমানিক ৩০০ কোটি ডলার বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে তেল বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, ব্যয়ের খাত এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য এর কতটা ব্যবহার হচ্ছে—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা তৈরি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ
ভেনেজুয়েলার তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাধীন গবেষণা সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস গত জুনে প্রশ্ন তুলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসেবে তুলে ধরলেও ঠিক কত পরিমাণ তেল বিক্রি হচ্ছে, কত রাজস্ব সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে—তার পরিষ্কার হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
ভেনেজুয়েলার সোনা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ থেকে আয় ও রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্বচ্ছতা রয়েছে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
ফলে তেল উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ার বিষয়টি একদিকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও অন্যদিকে তেল সম্পদ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েও বিতর্ক
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। কারাকাসে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আলোচনায় বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজকে যথাযথভাবে যুক্ত করা হচ্ছে না—এমন অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
অন্যদিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোসহ ভেনেজুয়েলার প্রধান বিরোধী দলগুলো মে মাসে একটি নতুন রাজনৈতিক রূপরেখায় সম্মত হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক আলোচনা এবং স্বাধীন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছে।
ফলে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা বাড়ছে।
নতুন স্বৈরাচারের আশঙ্কা
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস সতর্ক করেছে, ভেনেজুয়েলায় যদি যথাযথ জবাবদিহিতা ও সুস্পষ্ট গণতান্ত্রিক রূপরেখা না থাকে, তাহলে দেশটিতে নতুন করে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সংস্থাটির উদ্বেগের মূল বিষয় হলো—ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদ এবং এর মাধ্যমে অর্জিত রাজস্ব যদি একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার আওতায় না থাকে, তাহলে দেশটির জনগণ দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদের অধিকারী হয়েও ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক সংকট, কম বিনিয়োগ ও উৎপাদন দুর্বলতার সমস্যায় ভুগেছে। এখন উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি যদি তেল সম্পদ থেকে অর্জিত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দেশটির অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ
ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাড়ার ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন জ্বালানি সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার বিশেষায়িত পরিশোধনাগারের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী অপরিশোধিত তেল পাচ্ছে, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা তেল বিক্রির মাধ্যমে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
তবে এই অংশীদারিত্বের প্রকৃত সুফল কতটা ভেনেজুয়েলার জনগণের কাছে পৌঁছাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ভেনেজুয়েলার সামনে তাই একদিকে তেল উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ, অন্যদিকে তেল সম্পদের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। দেশটির বিপুল তেল সম্পদ যদি দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও জবাবদিহিমূলক শাসনের আওতায় আনা যায়, তাহলে দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হতে পারে।
অন্যথায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুদ থাকা সত্ত্বেও সেই সম্পদ দেশটির জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির যে দ্রুত বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, সেটি তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক পরিবর্তন নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের নতুন সমীকরণ।