• হোম > বাংলাদেশ > নিরাময়কেন্দ্রের আড়ালে ‘ক্যাচিং পার্টি’, বন্দিত্ব ও অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ

নিরাময়কেন্দ্রের আড়ালে ‘ক্যাচিং পার্টি’, বন্দিত্ব ও অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ

  • বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৬
  • ৩৪

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগের চিকিৎসার নামে পরিচালিত কিছু বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, রোগীকে আটকে রাখা, শারীরিক নির্যাতন, অর্থ আদায় এবং ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে এমন কিছু কেন্দ্রের কর্মকাণ্ডের তথ্য সামনে এসেছে, যেখানে চিকিৎসার আড়ালে রোগীদের দীর্ঘ সময় বন্দি করে রাখার পাশাপাশি তাদের স্বজনদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠানে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতার কারণে সুস্থ মানুষকেও নিরাময়কেন্দ্রে আটকে রাখার ঘটনা ঘটছে। এ কাজে কেন্দ্রগুলোর কথিত ‘ক্যাচিং পার্টি’ ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অর্থের বিনিময়ে কাউকে ধরে এনে মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

রাজধানীর অভিজাত গুলশান এলাকায় অবস্থিত বীকন পয়েন্ট নামের একটি নিরাময়কেন্দ্রকে ঘিরে করা অনুসন্ধানে এমন চিত্র উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী ব্যক্তির কাছ থেকে অন্তত তিন মাসের জন্য প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ চাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এর সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের খরচও যুক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রোগী ভর্তি করার আগে অগ্রিম দুই লাখ টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। অথচ মাদকাসক্ত রোগী হিসেবে কাউকে ভর্তি করার ক্ষেত্রে ডোপ টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার নিয়ম থাকার কথা।

অনুসন্ধানকালে একজনকে রোগীর ছদ্মবেশে ওই কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা অবস্থান করানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রবেশের সময় মোবাইল ফোন, ঘড়ি, কলমসহ ব্যক্তিগত সামগ্রী জমা নেওয়া হয়। এরপর তাকে কেন্দ্রটির নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে বাইরের মানুষের প্রবেশের সুযোগ ছিল না।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, কথিত রেড জোনে থাকা রোগীদের একটি অংশকে কোনো ধরনের যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিভিন্ন ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন তরুণ অবস্থান করছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রোগীদের সঙ্গে কথা বলে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। তাদের কেউ স্বেচ্ছায় এসেছেন, আবার কেউ ‘ক্যাচিং’ করে ধরে আনা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নও করা হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

খাবারের মান ও পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। রাতে রোগীদের মাছ, ডাল ও ভাত দেওয়া হলেও খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে ধূমপানের জন্য নির্দিষ্ট একটি ছোট কক্ষে অনেক রোগীকে একসঙ্গে রাখা হতো বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সম্পত্তির বিরোধে বৃদ্ধ শিল্পপতিকে আটকে রাখার অভিযোগ

অনুসন্ধানে মোহাম্মদ শাহজাহান নামের এক বৃদ্ধের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি নিজেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পপতি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার দাবি, মাদকাসক্ত না হওয়া সত্ত্বেও সম্পত্তির কারণে তাকে নিরাময়কেন্দ্রে আটকে রাখা হয়েছে।

শাহজাহানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি একাকিত্বে ভুগছিলেন এবং নতুন করে জীবনসঙ্গী নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এতে তার ছেলে ক্ষুব্ধ হন। পরে তাকে বাসা থেকে নিয়ে এসে মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচয় দিয়ে নিরাময়কেন্দ্রে আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার দাবি, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার কারণে বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। গুলশানে বাড়ি, গাজীপুরে খামার এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সম্পদের মালিক হলেও নিরাময়কেন্দ্রে বন্দি থাকার কারণে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ থেকেও তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

শাহজাহান আরও অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে নিরাময়কেন্দ্রের লোকজন কাউকে ধরে এনে আটকে রাখতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় মামলা বা পুলিশের ঝামেলায় না গিয়েই মানুষকে বন্দি রাখা সম্ভব বলেও তিনি দাবি করেন।

নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা জোরদারের দাবি

নিরাময়কেন্দ্রের আড়ালে এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু রোগীর অধিকার লঙ্ঘন নয়, গুরুতর মানবাধিকার ও আইনগত অপরাধেরও শামিল। বিশেষ করে চিকিৎসার নামে কাউকে জোর করে আটকে রাখা, নির্যাতন করা কিংবা মাদকাসক্ত না হয়েও মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন, চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবল, রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার মান এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়মিতভাবে তদারকি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগী ও তার পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ হওয়া জরুরি।

কোনো নিরাময়কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রোগীকে জোরপূর্বক আটকে রাখা, নির্যাতন বা অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ চিকিৎসার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে যাওয়া কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়ার সুযোগ কাউকে দেওয়া যেতে পারে না।

নিরাময়কেন্দ্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মাদকাসক্ত বা মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিকে নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে চিকিৎসা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। সেই জায়গায় যদি চিকিৎসার আড়ালে বন্দিত্ব, নির্যাতন কিংবা অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15506 ,   Print Date & Time: Wednesday, 19 August 2026, 12:43:57 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh