
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একসঙ্গে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথে গত এক মাসে পণ্য পরিবহনের ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তাও নতুন করে সামনে এসেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে জাহাজ চলাচলের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
পণ্য পরিবহনের ভাড়া ও মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান আর্গাসের তথ্য অনুযায়ী, পানামা খাল, রাইন নদী, লোহিত সাগর ও কৃষ্ণ সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পরিবহন ব্যয় রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। পানির স্বল্পতা ও সংঘাত—দুই ধরনের সংকটই এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।
হরমুজ সংকটে জাহাজ চলাচল
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আগে এই জলপথ দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হতো।
হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অনেক জাহাজকে এখন বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে। এতে শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, সামগ্রিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয়ও বেড়েছে।
বেলজিয়ামের জাহাজ পরিবহন কোম্পানি সিএমবি টেকের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার স্যাভেরিস বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ফ্রেইট রেট বুম’ বা জাহাজ ভাড়ার অস্বাভাবিক উল্লম্ফন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, পরিস্থিতি নজিরবিহীন। পরিবহন ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমানো বা বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে।
জ্বালানি পরিবহনে বাড়ছে ব্যয়
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে জ্বালানি পরিবহনে। হরমুজের পাশাপাশি বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতেও উত্তেজনা বেড়েছে। ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতের কারণে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো এ পথে হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এর প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনের ভাড়া গত ১০ আগস্ট ব্যারেলপ্রতি ১৫ ডলার ২২ সেন্টে পৌঁছেছে। ২০০৫ সালে আর্গাস এই ভাড়া পরিমাপ শুরু করার পর এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়।
কৃষ্ণ সাগরেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই পথে ভূমধ্যসাগরে ট্যাংকার পাঠানোর ভাড়া চলতি সপ্তাহে অন্তত ২০০৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথেও ছড়িয়ে পড়ছে।
খরায় পানামা খালে সংকট
শুধু যুদ্ধ নয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘস্থায়ী খরাও বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। পানামা খালে দীর্ঘ সময়ের খরা ও তীব্র এল নিনোর কারণে পানির স্তর কমে গেছে।
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিকল্প নৌপথ হিসেবে পানামা খালের ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে খালের দুই ধরনের লকে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত স্লট পেতে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ দিতে হচ্ছে।
আগস্টের শুরুতে পানামা খালের দুই সেট লকের নির্ধারিত স্লটের দাম যথাক্রমে ১১ লাখ ও ২৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। আর্গাসের তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ মূল্য।
রাইন নদীতেও পানির সংকট
ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ রাইন নদীতেও খরার প্রভাব পড়েছে। জার্মানির ভারী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় বার্জে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়েছে।
কোলোন, ডুইসবার্গ, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও কার্লসরুহের মতো শিল্পাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের ভাড়া ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে জার্মান শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
আর্গাসের ইউরোপীয় ফ্রেইট মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান জন ওলেটের মতে, নৌ-পরিবহন বাজারে এমন বড় ধরনের বিঘ্ন সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব কভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ, নৌপথের নিরাপত্তাহীনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পরিবহন ব্যয় বাড়তে থাকলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে পড়তে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।