• হোম > এক্সক্লুসিভ | বাংলাদেশ > বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

  • মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ২০:৪৬
  • ২৮

---

বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক কোনো সরলরৈখিক সমীকরণে চলে না। দীর্ঘ ইতিহাস, ভৌগোলিক নৈকট্য, অভিন্ন নদী ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান দুই দেশের সম্পর্ককে বহুমুখী রূপ দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর ঢেউ এসে লেগেছে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কে। নয়াদিল্লিতে দেওয়া তার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার প্রতিক্রিয়া এই টানাপোড়েনকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। অথচ ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক কোনো এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে পারে না।

গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় শেখ হাসিনার একটি অডিও বক্তব্য প্রচার হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে সতর্ক করেছে যে, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হলে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

ব্যাখ্যা যা-ই হোক না কেন, এ ঘটনা প্রমাণ করে যে দুই দেশের আস্থার জায়গায় কতটা ভঙ্গুরতা রয়েছে। ভারত থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি জানানোর পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। একই সঙ্গে তাকে কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি তোলার ক্ষেত্রেও ঢাকার অবস্থান এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—একটি নির্দিষ্ট সমস্যাকে কি পুরো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে?

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কোনো একক ব্যক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, পরিবহন এবং নিরাপত্তার মতো বহু দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নতুন করে পর্যালোচনা করা এবং তিস্তা সমস্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান খোঁজা আজ সময়ের দাবি। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে এই দুই দেশের কোনো পক্ষই অন্য পক্ষকে এড়িয়ে চলার বিলাসিতা দেখাতে পারে না।

জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনারের বক্তব্যেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের পক্ষ থেকে একাধিকবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণের পাশাপাশি আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই আমন্ত্রণগুলোকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এগুলো ঢাকার কূটনৈতিক পরিপক্বতা প্রমাণের বড় সুযোগ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর কিংবা ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে। কট্টরপন্থী মহল থেকে প্রশ্ন আসতেই পারে যে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকালে এ ধরনের সফর কতটা যৌক্তিক। কিন্তু কূটনৈতিক ক্ষেত্রে আবেগ বা জেদের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলে এমন বার্তা যেতে পারে যে, কেবল একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারিত হচ্ছে।

একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের কূটনীতি কখনোই একক ইস্যুভিত্তিক হতে পারে না। মতবিরোধ বা অসন্তোষ থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখাই কূটনীতির মূল দর্শন। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ভারতের আইনগত পর্যালোচনার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে জনগণের মনে অসন্তোষ বাড়া স্বাভাবিক। তবে শেখ হাসিনা নিজেও যেহেতু ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাই আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হলে তা নিজস্ব গতিতে আদালতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক যদি দীর্ঘকাল ধরে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যায়, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এর ফলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে কে? নিশ্চিতভাবেই দুই দেশের সাধারণ রপ্তানিকারক, আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ভোক্তা কিংবা সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবে না। পানি বণ্টনের অপেক্ষায় থাকা জনগোষ্ঠীও চরম ক্ষতির মুখে পড়বে।

এই দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতায় লাভবান হয় মূলত তারা, যারা বিভাজন ও উত্তেজনা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়। দুই দেশের রাজনৈতিক কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ খোঁজা তৃতীয় পক্ষগুলোই এই দূরত্ব থেকে ফায়দা নেয়। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে না তো অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কাম্য, না তো অকারণ বিরোধকে নীতিতে পরিণত করা উচিত।

বাংলাদেশ ও ভারতকে তাদের সম্পর্কের বরফ গলাতে হলে কতগুলো সুনির্দিষ্ট পথে হাঁটতে হবে: যেমন মতপার্থক্য লুকিয়ে না রেখে আলোচনার টেবিলে তা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরতে হবে। আইনি ও কূটনৈতিক চ্যানেলে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো সচল রাখতে হবে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আঞ্চলিক ফোরাম ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্পর্কের বরফ গলাতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, কূটনীতির অর্থ সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়; বরং মতবিরোধের মধ্যেও নিজের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়া। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তির চেয়ে অনেক বড়। তাই বিভাজনের রাজনীতি বা সাময়িক উত্তেজনার ফাঁদে না পড়ে, উভয় দেশেরই উচিত পরিপক্ব ও বাস্তবসম্মত কূটনীতির মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15494 ,   Print Date & Time: Wednesday, 19 August 2026, 02:02:14 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh