• হোম > এশিয়া | বিদেশ > রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের শর্ত নিয়ে বাড়ছে সংশয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের শর্ত নিয়ে বাড়ছে সংশয়

  • মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ২০:২১
  • ২২

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৩ লাখের কিছু বেশি মানুষকে ফেরত নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে মিয়ানমারের দেওয়া নতুন বিবৃতিকে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন রোহিঙ্গা নেতারা। তাদের অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকার, ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত এবং যাচাই-বাছাইয়ের জটিলতার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ তৈরি করছে মিয়ানমার।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও শর্ত রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থার সংকট আরও বাড়াচ্ছে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও পরিচয়ের বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রোহিঙ্গা নেতাদের আশঙ্কা, রাখাইনে চলমান সংঘাতের কারণে সেখানে দ্রুত স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না হলে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার’ শর্ত দেখিয়ে প্রত্যাবাসন আরও পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। তাদের মতে, যাচাই-বাছাইয়ের নামে নতুন জটিলতা তৈরি না করে আগে থেকেই থাকা তালিকার ভিত্তিতে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া উচিত।

রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় নিয়েও মিয়ানমারের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন নেতারা। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং দেশটিতে ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী নেই বলে দাবি করা হয়েছে। রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, এই অবস্থান তাদের দীর্ঘদিনের জাতিগত পরিচয়ের দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

রোহিঙ্গা নেতা নুরুল আমিন বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র প্রায় ৩ লাখকে ফেরত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে বাকি রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

উখিয়ার থাইংখালী ১৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেড মাঝি শামশুল আলমও নিরাপত্তা ও পরিচয়ের নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর আবারও নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই স্বীকৃতি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে আগ্রহী নন।

মিয়ানমারের দাবি

গত শনিবার মিয়ানমারের জান্তা সরকার জানায়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৩ লাখের বেশি মানুষ রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা। রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তাদের দেশে ফেরত নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে মিয়ানমার।

তবে মিয়ানমারের এই বক্তব্যকে পুরোপুরি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না রোহিঙ্গা নেতারা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নির্দিষ্ট সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ থাকলেও সেটিকে যেন প্রত্যাবাসনের চূড়ান্ত সীমা হিসেবে বিবেচনা করা না হয়।

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার আগ্রহকে ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে। তবে প্রত্যাবাসনের পর তাদের নিরাপত্তা, জীবনযাপন, নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রশ্ন

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ব্যাপক নির্যাতনের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর থেকে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাবাসনের আলোচনা চললেও নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় কার্যকরভাবে বড় পরিসরে প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, মিয়ানমার কোন ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করছে, তা বাংলাদেশের জানা নেই। তিনি জানান, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৮ লাখ ২৪ হাজার রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল। পরবর্তী সময়ে পরিবার ও সদস্যসংখ্যা বেড়ে বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

রোহিঙ্গা নেতাদের মতে, শুধু নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষকে ফেরত নেওয়ার ঘোষণা দিলেই প্রত্যাবাসন সমস্যার সমাধান হবে না। নিরাপদ পরিবেশ তৈরি, জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি, মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

ফলে মিয়ানমারের নতুন ঘোষণায় প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনার কথা উঠে এলেও বাস্তবে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের বাস্তব পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15492 ,   Print Date & Time: Wednesday, 19 August 2026, 02:02:00 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh