
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
২০২৩ সালেই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠনের তৎপরতা সম্পর্কে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম। সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০২৩ সালের মার্চে তিনি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। সেখানে ২০২৪ সালে সম্ভাব্য সরকার পরিবর্তন এবং নতুন সরকারে কারা থাকতে পারেন, তার একটি সম্ভাব্য রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল। তার দাবি, ওই প্রতিবেদনে যাদের নাম ছিল, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা কিংবা বিভিন্ন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান।
সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্রতিবেদনটি তিনি সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। প্রায় সাত-আট পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন শেখ হাসিনা পুরোটা পড়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
মনিরুলের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্ভাব্য জাতীয় সরকারের প্রধান হিসেবে সরাসরি দায়িত্ব দেওয়ার পরিবর্তে তাঁর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি ধারণা তুলে ধরা হয়েছিল। তবে প্রতিবেদনটি পড়ার পর শেখ হাসিনা তাঁকে বলেছিলেন, ইউনূস নিজেই ক্ষমতায় আসতে চাইবেন।
মনিরুল ইসলাম আরও দাবি করেন, ২০২৩ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার আগে সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়েও একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের দিকে পুরোনো ওই প্রতিবেদন উদ্ধার করে তিনি দেখতে পান, তাতে উল্লেখ করা বিভিন্ন বিষয় পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে অনেকাংশে মিলে গেছে।
২০২৩ সালের আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার দাবি
সাক্ষাৎকারে মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সরকার পরিবর্তনের একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছিল। তবে ওই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসায় পরিকল্পনাটি সফল হয়নি বলে তাঁর দাবি।
তিনি বলেন, এরপর ২০২৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে নতুন সরকার গঠিত হলে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছুটা আত্মতুষ্টি তৈরি হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক এসবি প্রধানের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার প্রক্রিয়া আরও আগে থেকে চলছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি কথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয়—এমন ধারণা থেকে ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলনকে কাজে লাগানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
নিরাপদ সড়ক ও কোটা আন্দোলনের প্রসঙ্গ
মনিরুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনকে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন। তাঁর দাবি, এসব আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্র ও তরুণদের ব্যবহার করে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করার চিন্তা করা হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার পেছনে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ভেতরেও কথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর প্রভাব ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
৫ আগস্টের ঘটনা নিয়ে মনিরুলের বক্তব্য
৫ আগস্টের আগে সরকার পতনের পরিকল্পনার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারণা পেয়ে থাকলে রাষ্ট্র এত দ্রুত ভেঙে পড়ল কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, আন্দোলন দমনের সরকারি পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও সেনাবাহিনীর একটি অংশ কাজ করেছিল। তাঁর ভাষায়, সরকারের পরিকল্পনার পেছনে সেনাবাহিনীর একটি অংশ ‘ছুরিকাঘাত’ করেছে।
তবে মনিরুল ইসলামের এসব বক্তব্য তাঁর সাক্ষাৎকারে দেওয়া দাবি ও বিশ্লেষণ। এগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে নয়, তাঁর বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।