• হোম > এশিয়া | বিদেশ > অরুণাচলে চীনের বিরুদ্ধে ভারতীয় ভূখণ্ড দখলের অভিযোগ

অরুণাচলে চীনের বিরুদ্ধে ভারতীয় ভূখণ্ড দখলের অভিযোগ

  • মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫০
  • ১০

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় চীনের বিরুদ্ধে নতুন করে ভূখণ্ড দখল এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টহল পয়েন্টে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের মিত্র আঞ্চলিক রাজনীতিকদের একটি অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনের পর বিষয়টি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম পার্বত্য জেলা আপার সুবানসিরি। স্থানীয় রাজনৈতিক দল পিপলস পার্টি অব অরুণাচলের চার সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দল সম্প্রতি ওই এলাকা পরিদর্শন করে। দলটির দাবি, সীমান্তের কিছু এলাকায় ভারতীয় বাহিনীর নিয়মিত টহল কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যবহৃত কিছু জমিতে চীনের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আবহাওয়ার কারণে টহলে বাধা

অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাসিং এলাকায় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর নিয়মিত টহল চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ওই সময়ে আকস্মিক বন্যা, প্রবল বৃষ্টিপাত ও ভূমিধসের কারণে দুর্গম সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগও ব্যাহত হয়।

অন্যদিকে, এই সময় চীনা বাহিনী সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় থাকে বলে দাবি করেছে অনুসন্ধানী দলটি। ফলে দুর্গম সীমান্তে ভারতের অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দলের সহসভাপতি কালিং জেরাংয়ের দাবি, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী শেরা-৫ নামের একটি টহল পয়েন্ট থেকে সরে যায়। এর ফলে ওই এলাকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

স্থানীয় একটি উপজাতীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিয়ে সীমান্ত এলাকায় চীনের কথিত ভূখণ্ড দখল নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে এই দখলের পরিমাণ বেড়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার ভারতের

তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশিত চীনের কথিত ভূখণ্ড দখলের অভিযোগকে ‘ভুল ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে চীনের বিরুদ্ধে নতুন কোনো ভূখণ্ড দখলের অভিযোগ স্বীকার করা হয়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়কে ভারত অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত পরিস্থিতি দুই দেশের বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, চীনও নতুন কোনো সীমান্ত উত্তেজনার অভিযোগ স্বীকার বা সরাসরি অস্বীকার করেনি। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, বর্তমানে চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল।

তিনি জানান, সম্প্রতি দুই দেশ সীমান্তবিষয়ক ৩৬তম বৈঠক করেছে। কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ

ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত এই সীমান্তের বড় একটি অংশ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

এমনকি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি ঠিক কোথায় অবস্থিত, তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে পূর্ণ মতৈক্য নেই। ফলে দুই দেশের সেনারা অনেক সময় এমন এলাকায় টহল দেয়, যেগুলো উভয় পক্ষই নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।

অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে বিরোধের ঐতিহাসিক ভিত্তিও দীর্ঘদিনের। ১৯১৪ সালের সিমলা কনভেনশনে ম্যাকমোহন রেখাকে সীমান্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও চীন এই সীমারেখাকে স্বীকৃতি দেয় না। বেইজিং পুরো অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ নামে অভিহিত করে।

অন্যদিকে ভারত অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

গালওয়ান থেকে ডোকলাম—বারবার উত্তেজনা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-চীন সীমান্তে একাধিকবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ানে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হন।

সিকিমের নাকু লা এলাকাতেও ২০২০ ও ২০২১ সালে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০১৭ সালে ভারত, চীন ও ভুটানের ত্রিদেশীয় সীমান্তবর্তী ডোকলাম এলাকায় চীনের সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে ৭৩ দিনের সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তের ছোট কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে। কারণ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার অবস্থান নিয়ে দুই দেশের দাবির মধ্যে এখনো পার্থক্য রয়েছে।

সম্পর্কে উন্নতি, তবু সীমান্তে অস্বস্তি

সীমান্তে বিরোধ থাকলেও ভারত ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

এই বাণিজ্যে ভারতের চীন থেকে আমদানির পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চীন থেকে ভারতের আমদানি ছিল ৬১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে চীনে ভারতের রপ্তানি ১০ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও দুই দেশের মৌলিক কৌশলগত বিরোধ এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে সীমান্ত সমস্যা পুরোপুরি সমাধান না হওয়ায় সম্পর্ককে স্বাভাবিকের পরিবর্তে ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখাই বাস্তবসম্মত।

ফলে অরুণাচল প্রদেশে চীনের কথিত ভূখণ্ড দখল এবং ভারতীয় সেনাদের টহল কার্যক্রমে বাধার নতুন অভিযোগ সত্যতা পেলে তা দুই দেশের সাম্প্রতিক সম্পর্কোন্নয়নের ধারায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করায় বিষয়টি নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

 

 


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15472 ,   Print Date & Time: Tuesday, 18 August 2026, 12:43:55 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh