
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানার অব্যবহৃত জমি উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস লিমিটেড ও করিম জুট মিলসের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কুষ্টিয়া সুগার মিলসের জমিতেও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ ও অব্যবহৃত শিল্পসম্পদকে নতুন বিনিয়োগের কাজে লাগানো, শিল্প স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। আগস্টে বেজার গভর্নিং বোর্ডের সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জমি বেজার কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে অভ্যন্তরীণ সড়ক, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বন্ধ শিল্পকারখানার জমিকে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলকে (ইপিজেড) সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ডেমরায় ১৩৩ একর জমি
ডেমরার লতিফ বাওয়ানী ও করিম জুট মিলস দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ক্রমাগত লোকসানের কারণে ২০০০ সাল থেকে কারখানা দুটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ। লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে এবং করিম জুট মিলস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে। পরে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠান দুটি বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে আসে।
করিম জুট মিলসের প্রায় ৫০ একর এবং লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের প্রায় ৮৩ একর জমি রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৩৩ একর জমি নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা এসব জমিতে নতুন শিল্প স্থাপন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কুষ্টিয়া সুগার মিলের ২২০ একর
কুষ্টিয়া সুগার মিলসের প্রায় ২২০ একর জমিতেও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ১৯৬৫-৬৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠিত এ চিনিকলটি শুরুর দিকে লাভজনক থাকলেও পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক লোকসানে পড়ে। ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে লোকসান বাড়তে থাকায় ২০২০ সালে মিলটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর মিলটির বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একপর্যায়ে মিলটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার ওই জমিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
বেজার নির্বাহী সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) সালেহ আহমেদ জানিয়েছেন, জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন করা হবে, তা নিয়ে কাজ চলছে। বন্ধ মিলগুলোর দায়দেনা পরিশোধের পর জমি হস্তান্তরের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
আদমজী ইপিজেডকে মডেল
বন্ধ শিল্পকারখানার জমিকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আদমজী ইপিজেডকে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখছে সরকার। দীর্ঘদিন লোকসানের পর ২০০২ সালের ৩০ জুন আদমজী জুট মিল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মিলের জমি বেপজার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে সেখানে গড়ে ওঠে আদমজী ইপিজেড। বর্তমানে প্রায় ২৯২.৬২ একর আয়তনের এ শিল্পাঞ্চলে ২৭৬টি শিল্প প্লট রয়েছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি সেখানে ৭৬ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
পোশাক, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক পণ্য, জুতা ও বিভিন্ন রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আদমজী ইপিজেড দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভবিষ্যতে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর আওতায় আসতে পারে
বেজার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কর্তৃপক্ষের আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি একক বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ গঠনের লক্ষ্যে সংসদে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে।
নতুন কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান হস্তান্তর, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে ডেমরা ও কুষ্টিয়ার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে সমন্বিত বিনিয়োগ উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হতে পারে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বন্ধ শিল্পের জমি নতুন করে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এসব এলাকায় নতুন শিল্প গড়ে ওঠার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক শিল্পায়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।