
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্য সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়োজনে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হয়েছে ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’।
প্রায় তিন বছর পর আয়োজিত দ্বিতীয় এই রাজস্ব সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সম্মেলনস্থলে পৌঁছান তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সরাসরি বৈঠক।
ফলে রাজস্ব আহরণের বর্তমান পরিস্থিতি, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, কর ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং এনবিআরের সক্ষমতা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি অবহিত করার পাশাপাশি রাজস্ব বাড়াতে সরকারের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাওয়ার বিষয়টিও সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য
২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা ৪৫ শতাংশের বেশি।
এত বড় রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনে শুধু করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন করদাতা শনাক্ত, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ এবং রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে কর আদায়ের বাস্তব সমস্যা, করদাতাদের সঙ্গে সম্পর্কের ঘাটতি, তদারকির দুর্বলতা এবং আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা না গেলে বড় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
কর-জিডিপি ১৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা
রাজস্ব সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এনবিআর ২০৩৫ সালের মধ্যে এ অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এ জন্য করের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা, কর ফাঁকি শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং রাজস্ব প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজস্ব প্রশাসনের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্মেলনে তুলে ধরবেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। নতুন নেতৃত্বের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে ‘টিম এনবিআর’ গড়ে তোলা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন কর্মউদ্দীপনা তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন চাপ ও প্রশাসনিক টানাপড়েনে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমিয়ে রাজস্ব আহরণে সবাইকে একই লক্ষ্যে কাজ করানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসকে একই প্ল্যাটফর্মে আনা
এবারের সম্মেলনে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস—রাজস্ব প্রশাসনের তিনটি প্রধান শাখাকে একই প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সরাসরি বাস্তব সমস্যাগুলো শুনে সেগুলোর ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কর ফাঁকি, ভ্যাট ফাঁকি, চোরাচালান, উৎসে কর আদায় এবং রাজস্ব প্রশাসনের তদারকি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে।
রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, করদাতাদের আস্থা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী ও করদাতাদের একটি বড় অভিযোগ হলো—কর দিতে গিয়ে নানা জটিলতা, হয়রানি ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়।
এ কারণে করদাতাদের সঙ্গে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সম্পর্ক আরও পেশাদার ও সেবামুখী করা, ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো এবং কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি সামনে রাখা হয়েছে।
কর ফাঁকি বন্ধে প্রযুক্তির ব্যবহার
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর ফাঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। করদাতাদের তথ্য বিশ্লেষণ, আয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কর প্রদানের তথ্যের সমন্বয় এবং নজরদারি ব্যবস্থাকে আধুনিক করার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি না করে করের আওতা বাড়ানো গেলে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিও শক্তিশালী হবে।
করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ
রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে কর ব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য করার প্রয়োজন রয়েছে।
করদাতারা যেন অনলাইনে সহজে কর-সংক্রান্ত সেবা নিতে পারেন এবং অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ছাড়াই কর পরিশোধ করতে পারেন—এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের জন্য রাজস্ব আহরণ বাড়ানো অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে সরকারি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনীতির গতি ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপর রয়েছে নানা চাপ। এ অবস্থায় নতুন করে করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং বিদ্যমান কর ব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধ করাকে তুলনামূলক কার্যকর পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় ১ হাজার ৫০০ অতিথির অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান এবং অর্থনীতি, রাজস্ব ও বাণিজ্য খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’ শুধু কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করার একটি আয়োজন নয়; বরং আগামী দিনে দেশের রাজস্ব প্রশাসনকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব করার একটি নীতিগত রূপরেখা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও দেখা হচ্ছে।