
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে ভারতের ১৪টি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা এটিই প্রথম বড় কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল। দুই দেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলমান থাকায় এই সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে ১৮ সদস্যের ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সফরকালে তারা বাংলাদেশের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার প্রতিনিধিদলের সদস্যদের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এ ছাড়া ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সঙ্গে একটি মধ্যাহ্নভোজ বৈঠক এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গেও প্রতিনিধিদলের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বুধবার সকালে ঢাকা ছাড়ার আগে ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ব্যবসায়ীদের সফর
ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে নানা ধরনের টানাপোড়েন রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিধিনিষেধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ভারতের বিভিন্ন সমুদ্র ও স্থলবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের কারণে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানিতে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
এর মধ্যে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত জমিতে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চুক্তি দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পর্যায়ে থাকা মতপার্থক্য কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে সফরটি গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্প স্থাপন এবং কর্মসংস্থান তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এমন সময়ে ভারতের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিদের ঢাকায় সফরকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি বৈঠকগুলোতে গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশেষ করে উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, অবকাঠামো, ভোগ্যপণ্য, প্রকৌশল ও শিল্প খাতে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নেতৃত্বে সিআইআই মহাপরিচালক
ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি। ১৮ সদস্যের প্রতিনিধিদলে ভারতের বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন।
প্রতিনিধিদলে রয়েছেন গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ প্রেসিডেন্ট রাকেশ স্বামী, ভারত বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুচিত্রা কে এল্লা, দ্য ইনফ্রাভিশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা ট্রাস্টি বিনায়ক চ্যাটার্জি এবং অরবিন্দ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পরম শাহ।
এ ছাড়া এলএমডব্লিউ গ্লোবালের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা পি জে রাজেশ, মাহিন্দ্রা গ্রুপের আঞ্চলিক প্রধান রাজেশ গুপ্ত, গোদরেজ কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের দক্ষিণ এশিয়া প্রধান কৃষ্ণা খাটোওয়ানি, ফোর্বস মার্শালের গ্রুপ হেড (ইন্টারন্যাশনাল অপারেশনস) দীপক শর্মা এবং অ্যাপোলো হসপিটালসের গ্রুপ হেড (ইন্টারন্যাশনাল অপারেশনস) এম এস গুরু প্রসাদসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী রয়েছেন।
সম্পর্কের বরফ গলাতে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা
রাজনৈতিক পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতা থাকলেও ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক শক্তিশালী করা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমাতে বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরকে শুধু বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সফর নয়, বরং দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে নতুন করে যোগাযোগ তৈরির একটি সুযোগ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
সফরে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, নীতিগত সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামো এবং বাজার সম্ভাবনা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের সামনে দেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
দুই দিনের এই সফর শেষে ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল কী ধরনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বা আগ্রহ প্রকাশ করে, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ মহলের নজরে রয়েছে।