
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মাদক ব্যবসার অভিযোগে দেশের বহুল ব্যবহৃত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজের বিরুদ্ধে মামলা করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। একই ঘটনায় দারাজের একজন পণ্য সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর বাড্ডা থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। এর আগে রোববার বিকেলে বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে পণ্য সরবরাহকারী আনিসুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সংশোধনী এনে সাইবার স্পেস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্যের অবৈধ কেনাবেচা, সরবরাহ, প্রচার ও লেনদেনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সংশোধিত আইনের এই ধারায় এটিই প্রথম মামলা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দারাজে বিক্রি হচ্ছিল ‘সিবিডি অয়েল’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দারাজের ওয়েবসাইটে ‘সিবিডি অয়েল’ নামে একটি পণ্য বিক্রি হচ্ছিল। পণ্যটি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করতে সংস্থাটির কর্মকর্তারা কয়েকটি পণ্য অর্ডার করেন।
একপর্যায়ে দারাজের ডেলিভারি কর্মীর মাধ্যমে অর্ডার করা সিবিডি অয়েল সরবরাহ করা হয়। পরে সংগৃহীত নমুনা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, পরীক্ষার ফলাফলে ওই সিবিডি অয়েলে উচ্চমাত্রায় টিএইচসি বা টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল পাওয়া যায়। টিএইচসি গাঁজার প্রধান মনঃপ্রভাবক উপাদানগুলোর একটি।
নমুনা পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার পরই পণ্যটির উৎপাদন ও সরবরাহের উৎস শনাক্ত করতে অভিযান চালানো হয়।
সাঁতারকুলে অভিযান, সরবরাহকারী গ্রেপ্তার
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা অঞ্চলের উপপরিচালক মেহেদী হাসান জানান, দারাজে বিক্রি হওয়া পণ্যে মাদকের উপাদান পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনস্থলে অভিযান চালানো হয়।
রোববার বিকেলে রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সিবিডি অয়েল ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
অভিযানের সময় ওই কারখানার মালিক এবং দারাজের পণ্য সরবরাহকারী আনিসুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা পণ্য ও উপকরণও জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আনিসুর রহমান দীর্ঘদিন জাপানে ছিলেন। সেখানে থাকাকালে গাঁজার তরল উপাদান ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের তেল তৈরির কৌশল রপ্ত করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। পরে দেশে ফিরে তিনি সুগন্ধি সাবান তৈরির আড়ালে ওই ধরনের পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক কেনাবেচায় কঠোর আইন
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮-এর সংশোধিত বিধানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য বা সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্সের অবৈধ ক্রয়, বিক্রয়, সরবরাহ, প্রচার, প্রস্তাব বা লেনদেনকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আইনের নির্দিষ্ট ধারায় এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ফলে অনলাইনভিত্তিক মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নতুন করে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিতে চায়। সংশোধিত আইনে সাইবার স্পেসে মাদক কেনাবেচার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দারাজের পাশাপাশি সন্দেহজনক অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপরও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
অনলাইন মার্কেটপ্লেসে পণ্য যাচাই নিয়ে প্রশ্ন
ই-কমার্সের প্রসারের সঙ্গে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে তালিকাভুক্ত পণ্যের বৈধতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য একই প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হওয়ায় সেগুলোর উৎস, উপাদান ও বৈধতা যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দারাজের বিরুদ্ধে করা মামলায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য কীভাবে প্ল্যাটফর্মে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছিল, তা তদন্তে পরিষ্কার হবে। একই সঙ্গে পণ্য সরবরাহকারী ও উৎপাদনকারীদের সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মটির ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, অনলাইনে মাদকদ্রব্যের প্রচার, বিক্রি বা সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। মামলার তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কথিত মাদকপণ্য বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটি সামনে আসবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।