• হোম > বাণিজ্য > ২৫ বছরের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সমুদ্রের সম্ভাবনা

২৫ বছরের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সমুদ্রের সম্ভাবনা

  • সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬, ২০:০২
  • ১৬

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও পরিবহণ খাতে জ্বালানির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে আমদানি করতে হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), জ্বালানি তেল ও কয়লা। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির দাম বাড়লেই একদিকে যেমন সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। ফলে আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল আমদানিনির্ভর রেখে পরিকল্পনা করলে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

এই বাস্তবতায় স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের সম্ভাব্য তেল-গ্যাস সম্পদের দিকে গুরুত্ব বাড়াচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে সমুদ্রভিত্তিক বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকেও ভবিষ্যতের জ্বালানি পরিকল্পনায় যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

এরই মধ্যে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক কোম্পানির জন্য তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে সরকার। এসব ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর সমুদ্রের (শ্যালো ওয়াটার) এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রের (ডিপ ওয়াটার) ব্লক। নতুন Offshore Model Production Sharing Contract (PSC) 2026-এর আওতায় এই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

নতুন চুক্তির কাঠামোয় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বেশ কিছু শর্ত সহজ করা হয়েছে। তবে শুধু বিডিং রাউন্ড আয়োজন করলেই সমুদ্রের জ্বালানি সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে না। এর সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত অনুসন্ধান শুরু হয়, কতগুলো অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কতটা আসে এবং আবিষ্কৃত সম্পদ কত দ্রুত জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করা যায়—তার ওপর।

আমদানিনির্ভর জ্বালানিতে বাড়ছে চাপ

বাংলাদেশের জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো আমদানিনির্ভরতা। দেশের গ্যাসের ঘাটতি পূরণে ক্রমেই বাড়ছে এলএনজি আমদানির প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় এবং সরকারের ভর্তুকির ওপর।

চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজারে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একটি এলএনজি কার্গো আমদানিতে আগে যেখানে প্রায় ৪৩৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল, পরে একই সরবরাহকারীর কাছ থেকে একটি কার্গো কিনতে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯০৮ কোটি টাকা।

এই ধরনের পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক সংঘাত, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি—সবকিছুই বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয়কে প্রভাবিত করতে পারে।

২৬ ব্লকে অনুসন্ধানের উদ্যোগ

সরকার গত ২৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে Offshore Bidding Round 2026 চালু করেছে। এর আওতায় বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে অনুসন্ধানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

নতুন PSC-তে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সিগনেচার বোনাস ও রয়্যালটি না রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের ব্রেন্টের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক সুবিধার মতো বিষয় রাখা হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ডে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এবার সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমিয়ে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানে আগ্রহী করে তোলা।

গ্যাস মিললে বদলাতে পারে অর্থনীতির হিসাব

বঙ্গোপসাগরে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে এর সুফল শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে এলএনজি আমদানির ওপর চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সার, বিদ্যুৎ, সিরামিক, টেক্সটাইল ও স্টিলসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে। এতে দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডলারে পরিশোধ করা জ্বালানি আমদানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে। ফলে একটি বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, শিল্পের সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু গ্যাস নয়, সমুদ্র হতে পারে নতুন জ্বালানি সীমান্ত

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২৫ বছরের পরিকল্পনায় বঙ্গোপসাগরকে শুধু গ্যাসের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। সমুদ্রভিত্তিক বায়ুশক্তিসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাও এখন থেকেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম সমুদ্রকে বৃহত্তর ‘ব্লু ইকোনমি’র অংশ হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, সমুদ্র শুধু মাছ, বন্দর বা পর্যটনের ক্ষেত্র নয়; মেরিন জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, নৌপরিবহণ, পর্যটন ও প্রযুক্তি মিলিয়ে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে।

তার মতে, বঙ্গোপসাগরে বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির চাপ কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে এবং শিল্প উৎপাদনের ব্যয়ও কমতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের প্রয়োজন

আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানির ঝুঁকি কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জ্বালানি দক্ষতা, উন্নত সঞ্চালন অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার সমন্বিত পরিকল্পনা।

এ জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি National Offshore Energy Strategy তৈরির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রথম ধাপে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে কী ধরনের সম্পদ রয়েছে, তার আধুনিক ও নির্ভুল বৈজ্ঞানিক মানচিত্র তৈরি করতে হবে। এজন্য 2D ও 3D সিসমিক জরিপ, ভূতাত্ত্বিক মডেলিং, তথ্য বিশ্লেষণ এবং অনুসন্ধান কূপ খননে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক হলেও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখে—এমন PSC কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। অনুসন্ধান থেকে উৎপাদন পর্যন্ত সময়ও কমিয়ে আনতে হবে। কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর অনুমোদন জটিলতা বা অবকাঠামোগত সমস্যায় বছরের পর বছর আটকে থাকলে তার অর্থনৈতিক সুফল কমে যাবে।

দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি দেশে একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক সেবা খাত গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। ড্রিলিং, সাবসি প্রকৌশল, মেরিন লজিস্টিকস, ভূতাত্ত্বিক সেবা, পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা প্রয়োজন।

এতে বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করলেও প্রযুক্তি, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সুবিধার একটি বড় অংশ দেশে রাখা সম্ভব হবে।

পাশাপাশি সমুদ্রভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য এখন থেকেই পরীক্ষামূলক প্রকল্প, সম্ভাব্যতা যাচাই ও গবেষণা শুরু করা প্রয়োজন। সৌর ও বায়ুশক্তির পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি ও আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থার উন্নয়নও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানির চাহিদা আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহারও বাড়বে। ফলে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কিংবা আরও বেশি জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণ করা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।

এ কারণে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাণিজ্যের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

তবে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস আবিষ্কৃত হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সম্পদ থেকে অর্জিত রাজস্বের একটি অংশ জ্বালানি অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জাতীয় সম্পদ তহবিলে রাখার মতো ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় পথ—দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর। বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে অনুসন্ধানের উদ্যোগ সেই বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

সমুদ্রের নিচে সম্পদ আবিষ্কার করাই শেষ লক্ষ্য নয়। সেই সম্পদকে কীভাবে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতায় রূপান্তর করা যায়, সেটিই হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি অর্থনীতির নতুন অধ্যায় তাই হয়তো মাটির নিচে নয়, বঙ্গোপসাগরের তলদেশেই লেখা হতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15445 ,   Print Date & Time: Monday, 17 August 2026, 04:22:10 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh