ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা কমে যাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে। সংঘাত ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ায় তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (১৭ আগস্ট) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম এক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ দশমিক ৪০ ডলারে পৌঁছায়। পরে দাম কিছুটা কমলেও সর্বশেষ লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭২ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ দশমিক ২০ ডলারে অবস্থান করছিল।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুড ফিউচার্সের দাম ৪৪ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক ৮৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমেছে
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক সময়ে ট্যাংকার ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কেপলারের জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার মাত্র পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। পরদিন রোববার কোনো পণ্যবাহী জাহাজই প্রণালিটি পার হয়নি। অথচ এর আগের সপ্তাহান্তে ৩১টি জাহাজ এই নৌপথ অতিক্রম করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অনিশ্চয়তা
সপ্তাহান্তে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে দেশটির নাগরিকদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত কমার সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সিঙ্গাপুরে ফিলিপ নোভার মার্কেট ইনসাইটসের প্রধান প্রিয়াঙ্কা সচদেভার মতে, আগস্টের শুরুতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর তেলের দাম এখন প্রায় পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় বাজারে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব আবারও বাড়ছে।
তবে তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে বড় ধরনের আগ্রাসনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া না গেলে তেলের দাম আরও ব্যাপকভাবে বাড়ার সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে ট্যাংকার বা তেল অবকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলে বাজারে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকতে পারে।
ট্যাংকারে হামলার পর বেড়েছিল তেলের দাম
হরমুজ প্রণালিতে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি বা এডিএনওসি পরিচালিত ট্যাংকার এবং সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগারে হামলার পর গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের ফিউচার্সের দামই ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
এরপর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন সংঘাতের গতিপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে তেলবাহী জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক হয় কি না, সেদিকে নজর রাখছেন।
আরও একটি জাহাজে হামলার অভিযোগ
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত শুক্রবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী এডিএনওসি পরিচালিত তৃতীয় একটি জাহাজে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ডব্লিউএএম এ তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হরমুজ প্রণালিতে এডিএনওসির আরও দুটি জাহাজকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্যও ইরানকে দায়ী করা হয়েছিল।
তবে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু হয় কি না, সেটিও আগামী দিনে তেলের দামের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।
