
কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক
গণপরিবহনে চড়ে গন্তব্যে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের জন্যই সুখকর হয় না। যানজট, গাদাগাদি ভিড় আর দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি তো রয়েছেই; এর সঙ্গে যদি যোগ হয় সহযাত্রীর অসচেতন ধূমপান, তবে সেই যাত্রা একরকম অসহনীয় হয়ে ওঠে। অথচ আইন অনুযায়ী দেশের সব পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপান পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্যের জন্য জরিমানার বিধানও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাগজে-কলমে থাকা এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে? চলন্ত বাসে কেউ ধূমপান করলে তাৎক্ষণিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা কি আমাদের হাতের কাছে আছে?
মাঠপর্যায়ের এই শূন্যতা বা এনফোর্সমেন্ট গ্যাপ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। চলতি বছরে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে অর্থদণ্ডের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। রাষ্ট্র আইনের কঠোরতা বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই আইন দৃশ্যমান ও দ্রুত প্রয়োগের ক্ষেত্রে কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে হলে পুলিশ বাহিনীকে নির্দিষ্ট ও সীমিত পরিসরে আইনি ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের টেবিলে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
আইনের উপস্থিতি বনাম প্রয়োগের ব্যবধান
আমাদের দেশের আইনি কাঠামোয় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করা হয়। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী ‘কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’-এর ধারণা রয়েছে। তাঁরা নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে প্রবেশ করে পরিদর্শন এবং আইন লঙ্ঘনকারীকে বহিষ্কার করতে পারেন। ২০১৫ সালের তামাক নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় নির্দিষ্ট পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তাকেও এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।
কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম আইনি পার্থক্য রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা ‘কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হওয়া এবং তাঁর ঘটনাস্থলে সরাসরি অর্থদণ্ড আরোপের ক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়। বর্তমান কাঠামোতে পুলিশ আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করতে পারলেও, সরাসরি অর্থদণ্ড দেওয়ার এখতিয়ার তাঁদের অনেকেরই থাকে না। ফলে বাস্তবে মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর নির্ভরতা থেকেই যায়। অথচ চলন্ত বাসে বা গণপরিবহনে অপরাধের স্থায়িত্ব হয় মাত্র কয়েক মিনিট। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়া সব সময় সম্ভব নয়।
পুলিশকে সীমিত ক্ষমতা দেওয়ার যৌক্তিকতা
সড়কে বা বাসস্ট্যান্ডে পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে। তাঁরা যদি ঘটনাস্থলেই আইন লঙ্ঘনকারীকে চিহ্নিত করে সীমিত ও নির্দিষ্ট শর্তে তাৎক্ষণিক অর্থদণ্ড বা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতেন, তবে পরিস্থিতি অনেক দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসত। এর অর্থ এই নয় যে পুলিশকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। বরং নির্দিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট পদমর্যাদার প্রশিক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তাকে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় এই ক্ষমতা দেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
এ ক্ষেত্রে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের মধ্যে একটি সুসমন্বিত রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে মূল ভিত্তি ধরে পরিবহন খাতের কমপ্লায়েন্স বা নিয়মানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে হবে। চালক, কন্ডাক্টর ও পরিবহনকর্মীদের আচরণবিধির সঙ্গে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা আরও কঠোরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
বিকল্প মডেল ও আইনি পথ
পুলিশকে সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা দিতে চাইলে সেটি কেবল মৌখিক আদেশে সম্ভব নয়। এর জন্য স্পষ্ট স্ট্যাটুটরি অথরিটি বা বিধিবদ্ধ আইনি কাঠামো প্রয়োজন। সরকারের সামনে কয়েকটি বিকল্প পথ খোলা থাকতে পারে:
• বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালায় সংশোধন এনে নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে সরাসরি অর্থদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া।
• অথবা সরাসরি জরিমানা না দিয়ে পুলিশকে অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রাথমিক প্রমাণ সংগ্রহ ও নথিবদ্ধকরণের দায়িত্ব দিয়ে মোবাইল কোর্টের সঙ্গে একটি দ্রুত সংযোগ স্থাপন করা।
• সড়ক পরিবহন আইনের নির্দিষ্ট ধারা বা ক্ষমতাবলে বিশেষ আদেশ জারি করা।
কোন মডেলটি সবচেয়ে উপযোগী হবে, তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পুলিশের সমন্বিত পর্যালোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
জবাবদিহি ও এসওপি (SOP) অপরিহার্য
পুলিশের হাতে যদি জরিমানার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়ই, তবে তার অপব্যবহার রোধে একটি স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউ বা এসওপি (SOP) থাকা বাধ্যতামূলক। এই প্রক্রিয়ায় পরিষ্কার থাকতে হবে—কোন কর্মকর্তা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন, অপরাধের প্রমাণ কীভাবে সংরক্ষিত হবে, যাত্রীর অভিযোগ কীভাবে যাচাই করা হবে এবং জরিমানার অর্থ কীভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে সুফল পাওয়ার বদলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
শুধু যাত্রীকে নয়, দায় নিতে হবে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদেরও
গণপরিবহনকে ধূমপানমুক্ত করার এই লড়াইয়ে কেবল একা যাত্রীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সমাধান নয়। প্রতিটি বাসে দৃশ্যমান স্থানে ধূমপান নিষেধের সাইনেজ ঝোলানো নিশ্চিত করতে হবে। চালক ও কন্ডাক্টরদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে এবং যাত্রীদের তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানোর পথ সুগম রাখতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট পরিবহনে বারবার ধূমপানের ঘটনা ঘটলে সেই পরিবহন মালিক বা কোম্পানির বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা দরকার।
আইন প্রণয়ন করা এক জিনিস, আর তার সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া অন্য জিনিস। গণপরিবহনে ধূমপান বন্ধের বিষয়টি আজ কেবল তামাক নিয়ন্ত্রণের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সাধারণ যাত্রীর নিরাপদ যাতায়াত এবং জনস্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পুলিশকে সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়া হোক কিংবা তাঁদের মাধ্যমে দ্রুত বিচারিক linkages তৈরি করা হোক—উদ্দেশ্য একটাই, আইন যেন মাঠে সক্রিয় থাকে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ঐকমত্য এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে একটি কার্যকর এনফোর্সমেন্ট আর্কিটেকচার গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আইন কাগজে বন্দি থাকার জন্য নয়, মানুষের বাস্তব জীবনকে স্বস্তিদায়ক করার জন্যই প্রণীত হয়।