
বিশেষ প্রতিনিধি
যে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পথচলা সবসময়ই বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণকারী এসব সরকারের সামনে যেমন দেশ পরিচালনার মূল কাঠামো সচল রাখার চাপ থাকে, তেমনি থাকে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের প্রত্যাশাও। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসের শাসনকাল কেবল সংস্কারের আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর পাশাপাশি তৈরি হয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক। রাষ্ট্র পরিচালনা, সংবিধানের ব্যাখ্যা, মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো সরকারের কার্যক্রম সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তবে যখন প্রশ্নগুলো সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার বা বিচারিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন তা কেবল রাজনৈতিক বাক্যযুদ্ধে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। এগুলোর জন্য প্রয়োজন আইনি কাঠামোর ভেতর থেকে তথ্যভিত্তিক চুলচেরা বিশ্লেষণ। কোনো অভিযোগ ওঠা মানেই তা চূড়ান্ত সত্য নয়, আবার তা হালকাভাবে এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। এর ৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদে অসাংবিধানিক পন্থায় সংবিধানের বিধান পরিবর্তন বা এর প্রতি আস্থা পরাহত করার উদ্যোগকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউনূস সরকারের আমলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারির পর থেকেই এই সাংবিধানিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সমালোচকদের মূল আপত্তি এখানেই যে, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের যেকোনো বিধান সংযোজন বা পরিবর্তনের নির্দিষ্ট সংসদীয় প্রক্রিয়া রয়েছে। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোট ছাড়া এভাবে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মৌলিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে সংবিধানের বিধান না থাকা সত্ত্বেও গণভোটের জন্য অধ্যাদেশ জারির বিষয়টিও আইনি বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে। এই সাংবিধানিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের বিচারিক পর্যালোচনা অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস সংবিধান রক্ষা, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী সবার প্রতি যথাবিহিত আচরণ করার শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বৈষম্য, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নানা অভিযোগ উঠেছে।
সংবিধানের ২৬ থেকে ৪৭ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে, এই ১৮ মাসের শাসনামলে আইনের দৃষ্টিতে সমতার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে আটক রাখা, যথাযথ আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, বিভিন্ন পেশাজীবীর কর্মস্থলে বাধা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় ভয়ের পরিবেশ তৈরির যেসব অভিযোগ রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। রাষ্ট্র যখন নিজে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন তার নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
আন্তর্জাতিক চুক্তি ও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন
সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার এবং রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপনের বিধান রয়েছে। ইউনূস সরকারের সময়কালে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতার খবর প্রকাশ পেয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
এর পাশাপাশি, ড. ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ট্রাস্টের সরকারি অনুমোদন, কর-সুবিধা এবং প্রশাসনিক লাইসেন্স পাওয়া নিয়েও গুরুতর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি বা গ্রামীণ টেলিকমসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও পেমেন্ট সার্ভিস চালুর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। একজন সরকারপ্রধান দায়িত্বে থাকাকালীন তার নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে বিশেষ সুবিধা পেল—সেটি ক্ষমতার অপব্যবহারের খাতার বাইরে রাখা যায় না। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় এ ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন মামলা দ্রুত পরিবর্তন বা নিষ্পত্তি হওয়ার পেছনে নির্বাহী ক্ষমতার কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন মহল। বিচারিক কার্যক্রমে বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপও যদি প্রমাণিত হয়, তবে তা আইনের শাসনের জন্য বড় আঘাত। একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে অব্যবস্থাপনা এবং এর ফলে শিশুদের প্রাণহানির মতো ঘটনাগুলোতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও কম গুরুত্বের নয়। দণ্ডবিধির ৩০৪ক ধারা অনুযায়ী অবহেলামূলক কাজের কারণে মৃত্যুর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নীতিগত ব্যর্থতা এবং ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়—উভয় বিষয়কেই চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে আলাদা করে মূল্যায়ন করতে হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এই অভিযোগগুলোকে নিছক রাজনৈতিক বিরোধিতার চোখে দেখা ভুল হবে। সংবিধান লঙ্ঘন, দুর্নীতি, মৌলিক অধিকার হরণ কিংবা প্রশাসনিক অবহেলার প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা আবশ্যক।
এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা। কমিশনের কাজ হবে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা, সরকারি নথিপত্র যাচাই করা এবং পক্ষপাতহীনভাবে সত্য উদঘাটন করা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে, আর প্রমাণের অভাবে অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তাও স্পষ্টভাবে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। দিনশেষে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, আবার কেবল রাজনৈতিক বা আক্ষরিক অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই বিতর্কের অবসান ঘটানো সম্ভব।