![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন গণমুখী ও সংস্কারধর্মী উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশ দ্রুত পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তাঁর দাবি, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট কাটিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) বাংলাদেশ সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মাহদী আমিন। সাক্ষাৎকারে তিনি সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শ্রমবাজার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার ও পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে।
কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নানা উদ্যোগ
সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে সুদে-আসলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এতে দেশের ১৩ লাখের বেশি কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
সরকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তাঁর মতে, এই কর্মসূচি শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিবার ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ অনেক নারী সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো এবং ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। তবে কার্ড বিতরণে কিছু কারিগরি অসংগতি ধরা পড়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ডেটাবেজ হালনাগাদ এবং ‘প্রক্সি মিন্স টেস্ট’ সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগী নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের জন্য সরকারি ভাতা চালু, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের মতো কর্মসূচিও সরকারের সামাজিক ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন মাহদী আমিন। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা জ্বালানি সংকট অল্প সময়ে পুরোপুরি সমাধান করা কঠিন। তবে সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক কম দামে গ্যাস ও জ্বালানি সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছে।
মাহদী আমিন জানান, মার্কিন ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর পবিত্র রমজান ও দুটি ঈদে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও বোনাস যথাসময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম সাফল্য।
বন্ধ শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগ
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বিদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি জানান, মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগস্টের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে জটিলতার অবসান হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। শ্রমবাজার চালু হলে পরবর্তী চার মাসে অন্তত এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মীর মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও জানান মাহদী আমিন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু নির্দিষ্ট কোনো খাতে নয়, রিয়েল এস্টেট, কৃষি ও উৎপাদন খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ তৈরির চেষ্টা চলছে।
এ ছাড়া জাপান, ওমান, জর্ডান এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জামানতবিহীন বিশেষ ঋণ সুবিধা এবং পূর্ব ইউরোপের নতুন শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মাহদী আমিন দাবি করেন, সরকার পুলিশ ও প্রশাসনকে আরও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, কোনো অপরাধীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ছাড় না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গুরুতর অপরাধ থেকে শুরু করে ছোটখাটো অপরাধ—সব ক্ষেত্রেই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া চালু রাখার চেষ্টা করছে সরকার।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, গত ছয় মাসে দেশে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকারের সমালোচনা কিংবা বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যেও রাজনৈতিক ধৈর্য ধরে সরকার দেশ পরিচালনা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে পররাষ্ট্রনীতি
বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রেও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন মাহদী আমিন। তাঁর মতে, ভারতসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সমতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় সরকার।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তাঁকে দেশে ফেরানোর যে আইনি প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করে ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
ব্যবসা সহজ করতে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ কার্যকর করা, বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্গো সেবা চালু এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তাঁর মতে, বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা গেলে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনীতির গতি আরও ত্বরান্বিত হবে।
সবশেষে মাহদী আমিন বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভুলত্রুটি সংশোধনের সুযোগ থাকে। সরকারের সততা, সদিচ্ছা ও দায়বদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, আত্মমর্যাদাশীল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।