![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারণা কিংবা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার ঘটনা নতুন নয়। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠছে। বাস্তব মানুষের মতো দেখতে ছবি ও প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় অনলাইনে কোন অ্যাকাউন্টটি সত্যিকারের আর কোনটি ভুয়া, তা অনেক সময় সহজে বোঝা যায় না।
এমন পরিস্থিতিতে ভুয়া পরিচয় ও নকল অ্যাকাউন্টের ঝুঁকি কমাতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে মেটা। ফেসবুকে চালু হতে যাচ্ছে বিনামূল্যের ‘ফেসবুক ভেরিফায়েড’ ব্যাজ। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর পরিচয়ের সত্যতা যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।
এই ভেরিফিকেশন চালু হলে অপরিচিত কারও সঙ্গে যোগাযোগ, ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে কেনাকাটা, বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত হওয়া কিংবা অনলাইনে লেনদেনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রোফাইলটি বাস্তব ব্যক্তির কি না, তা বোঝা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
যেভাবে হবে পরিচয় যাচাই
নতুন ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীকে একটি ছোট ভিডিও সেলফি দিতে হবে। মেটার প্রযুক্তি ওই ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির মুখের সঙ্গে তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে ব্যবহৃত ছবির মিল যাচাই করবে।
শুধু মুখের মিল দেখেই ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হবে না। অ্যাকাউন্টটি ফেসবুকের নির্ধারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য ও যাচাই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে ‘ফেসবুক ভেরিফায়েড’ ব্যাজ যুক্ত হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাটি বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ফলে আলাদা কোনো সাবস্ক্রিপশন ফি পরিশোধ না করেই যোগ্য ব্যবহারকারীরা পরিচয় যাচাইয়ের সুবিধা নিতে পারবেন।
কোথায় দেখা যাবে ভেরিফায়েড ব্যাজ
প্রাথমিকভাবে ফেসবুকের ব্যবহারকারীর প্রোফাইল, ফেসবুক মার্কেটপ্লেস, ডেটিং এবং বিভিন্ন গ্রুপে এই ভেরিফিকেশন ব্যাজ দেখা যেতে পারে। ভবিষ্যতে ফেসবুক ফিডে প্রকাশিত পোস্টের পাশেও ব্যাজ প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি চালু হলে অনলাইন কেনাবেচা কিংবা অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা একটি অতিরিক্ত তথ্যসূত্র পাবেন। কোনো প্রোফাইলে ভেরিফায়েড ব্যাজ থাকলে অন্তত ওই অ্যাকাউন্টের পরিচয় যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বোঝা যাবে।
বিশেষ করে মার্কেটপ্লেসে পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বেশি হতে পারে। কারণ ভুয়া পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে ক্রেতা বা বিক্রেতাকে প্রতারণার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়।
সবাই কি পাবেন বিনামূল্যের ভেরিফিকেশন?
নতুন সুবিধাটি মূলত ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টের জন্য চালু করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী এবং ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা ব্যবহারকারীরা এই ভেরিফিকেশনের আওতায় আসতে পারবেন।
তবে সব ধরনের অ্যাকাউন্ট এই সুবিধার আওতায় থাকবে না। ফেসবুক পেজ কিংবা প্রফেশনাল মোড অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে নতুন বিনামূল্যের ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে না বলে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের পরিচয় যাচাইয়ের ওপরই নতুন উদ্যোগটির মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফেসবুক ভেরিফায়েড ও মেটা ভেরিফায়েড এক নয়
নতুন ‘ফেসবুক ভেরিফায়েড’ ব্যাজ নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে—এটি কি মেটা ভেরিফায়েডেরই আরেকটি সংস্করণ? আসলে দুটি সেবা এক নয়।
মেটা ভেরিফায়েড হলো অর্থের বিনিময়ে নেওয়া একটি সাবস্ক্রিপশন পরিষেবা। এর সঙ্গে অ্যাকাউন্ট সুরক্ষা, গ্রাহক সহায়তা এবং অন্যান্য অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত থাকতে পারে।
অন্যদিকে নতুন ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজ বিনামূল্যের। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পেছনে একজন বাস্তব ব্যক্তি রয়েছেন কি না, সেটি যাচাই করা।
তবে কোনো অ্যাকাউন্টে এই ব্যাজ থাকার অর্থ এই নয় যে মেটা ওই ব্যক্তিকে বিশেষভাবে বিশ্বাসযোগ্য, জনপ্রিয় বা অনুমোদিত ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। ব্যাজটির মূল উদ্দেশ্য পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি বোঝানো।
ভুয়া অ্যাকাউন্ট কি পুরোপুরি বন্ধ হবে?
বিনামূল্যের ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু হলেও ফেসবুকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ অনলাইনে পরিচয় জালিয়াতির ধরন ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রতারকরাও নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করছে।
তবে পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ানো হলে নকল প্রোফাইল শনাক্ত করা এবং ব্যবহারকারীদের সতর্ক হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির নাম ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন ব্যাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার কারণে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ছবি তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় শুধু প্রোফাইলের ছবি দেখে কোনো অ্যাকাউন্টকে আসল বলে ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পরিচয় যাচাইয়ের মতো অতিরিক্ত ব্যবস্থা ব্যবহারকারীদের অনলাইন নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে ব্যবহারকারীদেরও সতর্ক থাকতে হবে। ভেরিফায়েড ব্যাজ থাকলেও অনলাইনে অর্থ লেনদেন, ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া কিংবা অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ভুয়া পরিচয়, নকল প্রোফাইল এবং এআই-নির্ভর প্রতারণার ঝুঁকি মোকাবিলায় ফেসবুকের বিনামূল্যের ভেরিফিকেশন ব্যাজ নতুন একটি পদক্ষেপ। ধাপে ধাপে বিভিন্ন দেশে এই সুবিধা চালু হলে ব্যবহারকারীদের কাছে আসল ও নকল প্রোফাইলের পার্থক্য বোঝার জন্য আরও একটি কার্যকর সূত্র তৈরি হতে পারে।