![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। সৌদি আরবের বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের বড় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতার সমন্বয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
তিন দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গঠিত সামরিক জোট হিসেবে দেখা হলেও এর সম্ভাব্য কৌশলগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে ভারত এই নতুন সমীকরণকে নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে।
চুক্তির সমালোচকদের মতে, প্রচলিত অর্থে এটি কোনো সামরিক জোট নয়। কারণ একটি সামরিক জোটের ক্ষেত্রে সাধারণত অভিন্ন শত্রু বা নির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকি থাকে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের কৌশলগত স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। ফলে চুক্তিটি বাস্তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র উৎপাদনে সহযোগিতার ক্ষেত্রেই বেশি কার্যকর হতে পারে।
পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানির মতে, তিন দেশের শত্রু এক নয়। তাই এটিকে সামরিক জোটের চেয়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত। তার মতে, চুক্তির মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ অস্ত্র উৎপাদন বাড়তে পারে। তবে এটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করা ঠিক হবে না।
তবে চুক্তির গুরুত্ব বুঝতে হলে তিন দেশ একে অপরকে কী দিতে পারে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের হাতে রয়েছে বিপুল আর্থিক সক্ষমতা। তেলসম্পদ থেকে পাওয়া অর্থের মাধ্যমে রিয়াদ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মিত্রদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সহায়তা করার সুযোগ রাখে।
অন্যদিকে তুরস্ক গত কয়েক দশকে নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করেছে। ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও বিভিন্ন আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশটির সক্ষমতা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে তুরস্কের বায়রাকতার টিবি২ ড্রোন বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি হলো তার বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং পারমাণবিক সক্ষমতা। ফলে তিন দেশের সক্ষমতাকে একসঙ্গে দেখলে অর্থ, প্রযুক্তি ও সামরিক প্রতিরোধক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় তৈরি হয়।
চুক্তিতে কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে কোনো সদস্য রাষ্ট্র অন্য একটি দেশের সংঘাতে কতটা সরাসরি যুক্ত হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ তিন দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত স্বার্থ সব ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়।
ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই নতুন সমীকরণে ভারতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় তুরস্ক পাকিস্তানের পাশে ছিল এবং পাকিস্তানকে ড্রোনসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।
ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও বাড়াতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া তুরস্কের বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সামরিক আধুনিকায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সৌদি আরবের অবস্থান তুলনামূলকভাবে জটিল। রিয়াদের সঙ্গে ভারতের যেমন ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি পাকিস্তানের সঙ্গেও সৌদির দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ভারতে সৌদি বিনিয়োগ এবং দেশটিতে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় কর্মীর উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ফলে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের মতো পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে একই সঙ্গে দুই পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরাসরি কোনো পক্ষ নেওয়ার বদলে রিয়াদ সংঘাত দ্রুত থামানোর চেষ্টা করতে পারে বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা।
চুক্তির লক্ষ্য আসলে কে?
সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—এই চুক্তি আসলে কাকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে?
ভারত সরাসরি এই চুক্তির লক্ষ্য নয়। একইভাবে ইয়েমেনের হুথি কিংবা ইরানকেও তিন দেশের অভিন্ন শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবেই চুক্তিটিকে দেখা উচিত।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টাও এই চুক্তির অন্যতম কারণ। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার এবং ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত বৈদেশিক নীতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করেছে।
এ কারণে মক্কা চুক্তিকে সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলার একটি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলকে ঘিরেও বাড়ছে আলোচনা
চুক্তিটির আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব ইসরায়েলকে ঘিরে। গাজা যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং ইসরায়েল-তুরস্কের সম্পর্কের টানাপোড়েন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণকে আরও জটিল করেছে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, জোটটির পেছনে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা ভবিষ্যতে অন্য কোনো মিত্র দেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হবে—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বিষয়টি নিয়ে কৌশলগত আলোচনা থাকলেও এটিকে বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবে ধরে নেওয়া এখনই যথাযথ নয়।
আরও দেশ যুক্ত হতে পারে?
তিন দেশের এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে মিশরের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। মিশর যুক্ত হলে আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তিকে এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে এবং জোটটির ভৌগোলিক প্রভাবও বাড়বে।
অন্যদিকে এই সমীকরণের বিপরীতে ভারতও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে। ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগকে অনেকে নতুন আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরির অংশ হিসেবে দেখছেন। যদিও ভারত আনুষ্ঠানিক কোনো পাল্টা সামরিক জোট গঠনের কথা অস্বীকার করেছে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার সমন্বয়কে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখনই ‘মুসলিম ন্যাটো’ হয়ে উঠছে—এমন দাবি করার মতো পরিস্থিতি না থাকলেও চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই এই জোটের পরবর্তী বিকাশ, সম্ভাব্য নতুন সদস্য এবং তিন দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার গভীরতা ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।