• হোম > বাংলাদেশ > তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দিল্লির বার্তার অপেক্ষা

তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দিল্লির বার্তার অপেক্ষা

  • রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৭
  • ৭

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দ্রুত দিল্লি গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এখন তার বহন করে আনা বার্তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে তারেক রহমানের ভারত সফরের পরবর্তী সিদ্ধান্ত।

সূত্রের খবর, শুক্রবার বিকেলে ঢাকায় ফিরে আসা ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী আজ দিনের যেকোনো সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। ওই বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে দেওয়া বার্তা এবং ঢাকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ইতিবাচক বার্তা এলে চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে ঢাকার প্রত্যাশা অনুযায়ী ভারতের অবস্থান না এলে সফর নিয়ে বাংলাদেশ বিকল্প সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরই দিল্লি সফর

গত ১০ আগস্ট প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঢাকার অবস্থান তুলে ধরা হয়। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরই দ্রুত দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন ত্রিবেদী। পরদিন ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরার পাশাপাশি ঢাকার বার্তার জবাবও নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এরপর শুক্রবার বিকেলে ঢাকায় ফিরে আসেন ভারতীয় হাইকমিশনার। এখন তার সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্ভাব্য বৈঠককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে দুই দেশের কূটনৈতিক মহল।

হাসিনা ইস্যুতে সম্পর্কের টানাপোড়েন

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ইস্যুটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান নেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়।

এর মধ্যেই গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার নিয়ে তার বক্তব্যের পর ঢাকার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

এর আগে এ ধরনের বক্তব্যের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ভারতীয় হাইকমিশনারকে সতর্ক করেছিল বাংলাদেশ। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারতের মাটিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরির সুযোগ পান, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সতর্কতার পরও শেখ হাসিনা ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ায় ঢাকার অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে নিয়ে শেখ হাসিনার কোনো বক্তব্যের প্রতি তাদের সমর্থন নেই।

ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক

শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর গত ৯ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে শেখ হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশের ক্ষোভের বিষয়টি সরাসরি ভারতীয় পক্ষকে জানানো হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী তখন আশা প্রকাশ করেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ঢাকার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছে।

এর পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ত্রিবেদী। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও তার বৈঠক হয়। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে ভারত মনে করে, দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রথমে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে সরাসরি বৈঠক হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারও বলেছেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে।

ভারত সফরের আমন্ত্রণ ও নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রথম সফরে ভারতে নেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছিল নয়াদিল্লি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা দেশটির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন।

তবে সে সময় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া এবং দ্বিতীয় সফরে চীন যান।

বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের দিকে ভারতের বিশেষ নজর ছিল বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ওই সফরের সময়ই তড়িঘড়ি করে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী রাষ্ট্রপতির কাছে তার পরিচয়পত্র জমা দেন। এর পরদিন প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর ভারতীয় ভিসা সেন্টার খোলার ঘোষণা আসে।

ব্রিকস সম্মেলন নিয়েও জটিলতা

তারেক রহমানের ভারত সফরের আলোচনার পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

গত ২৩ জুলাই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছিলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তবে আমন্ত্রণপত্রের ধরন নিয়ে ঢাকার আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সরাসরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এক ব্রিফিংয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিমসটেকের চেয়ারম্যানকে। এই পার্থক্যকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে ঢাকা। ফলে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ভারত সফর নিয়ে বাড়ছে কূটনৈতিক তৎপরতা

গত ৩০ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ওই বৈঠকের পর তিনি জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য নয়াদিল্লি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

এরপর থেকেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে আগামী সপ্তাহেই সফর হতে পারে বলে খবর প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশ সরকার এখনো সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানায়নি।

বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে নয়াদিল্লির অবস্থান। বিশেষ করে শেখ হাসিনা ইস্যু, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিবেশ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী—তার ওপরই সফরের সিদ্ধান্ত অনেকটা নির্ভর করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষা

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক, এরপর তার দ্রুত দিল্লি সফর এবং নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্ট হয়েছে।

এখন দীনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে আসা দিল্লির বার্তা ঢাকার কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলে চলতি মাসেই তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা জোরালো হতে পারে। আর ঢাকার প্রত্যাশার সঙ্গে নয়াদিল্লির অবস্থানের বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে সফরটি পিছিয়ে যেতে পারে বা বাংলাদেশ নতুন কোনো কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর শেষ পর্যন্ত হবে কি না, তা নির্ধারণে এখন মূল নজর দিল্লির ফিরতি বার্তার দিকে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15352 ,   Print Date & Time: Sunday, 16 August 2026, 07:22:16 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh