• হোম > বিদেশ > হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত তীব্র, বাড়ছে তেলের দাম

হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত তীব্র, বাড়ছে তেলের দাম

  • শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:০৩
  • ৯

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। একদিকে ইরান প্রণালিটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কথা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পরাজয় মেনে নেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে বলে মার্কিন নাগরিকদের প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সংঘাত বন্ধে শান্তি আলোচনা যেমন এগোচ্ছে না, তেমনি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়েও স্বাভাবিকভাবে তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে না।

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ইরানের হাতেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নেবে এবং ‘অবাস্তব কল্পনা’ থেকে সরে না আসবে, ততক্ষণ এই অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

গারিবাবাদি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে, বিমানবাহী রণতরি পাঠিয়ে, সরকারি আদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে হরমুজ প্রণালি দখল করা সম্ভব নয়।

আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেয়নি ইরান

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ইরানি সংবাদমাধ্যম শাহারারা নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত ইরানের শর্ত পূরণ করতে হবে।

ফলে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা থাকলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী।

জ্বালানির দাম বাড়ার শঙ্কা

অন্যদিকে সংঘাতের প্রভাব নিয়ে মার্কিন জনগণকেও সতর্ক করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে শুক্রবার এক রাজনৈতিক সমাবেশে তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার জন্য মার্কিন নাগরিকদের কিছুটা বাড়তি জ্বালানি খরচ মেনে নিতে হতে পারে।

ট্রাম্প ইরানকে ‘ভীষণ শয়তান একটি দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না দেওয়ার বিনিময়ে গ্যাসোলিনের জন্য সামান্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করা গ্রহণযোগ্য।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম প্রায় ৪ দশমিক ০৮ ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের তুলনায় এ দাম প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশটির মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

নির্বাচনি প্রচারণার সময় ট্রাম্প জ্বালানি খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনে তার প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাড়ছে আন্তর্জাতিক তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও দেখা যাচ্ছে। শুক্রবার ক্রুড অয়েলের ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১ ডলার বেড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৬ শতাংশ এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম প্রায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুক্রবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র দুটি জাহাজ চলাচল করেছে। সেগুলোর কোনোটি অপরিশোধিত তেল পরিবহন করেনি। কিছু জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে গোপনে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলেও তা যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনায় অত্যন্ত কম।

যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টিরও বেশি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত।

অর্থনৈতিক চাপে ইরানও

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের কারণে ইরানের অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাম্প্রতিক এক ভাষণে উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে।

অন্যদিকে ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প ও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আগামী সপ্তাহেই আরও কঠোর পদক্ষেপ ঘোষণা করা হতে পারে।

ভেস্তে যাচ্ছে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা

এর আগে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত থামাতে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার আভাস পাওয়া গেলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই উদ্যোগ কার্যত ভেস্তে গেছে।

আরাগচি বলেছেন, এমন কোনো যুদ্ধবিরতি ছিল না যার মেয়াদ এখন বাড়ানো হবে। তাদের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমাপ্তি; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই অবস্থান থেকে অনেকটাই ভিন্ন।

ফলে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবস্থান শুধু দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনাই বাড়াচ্ছে না, বরং বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানির দাম—সব ক্ষেত্রেই নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15326 ,   Print Date & Time: Saturday, 15 August 2026, 03:57:04 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh