• হোম > বিদেশ > আন্তর্জাতিক আকাশে চীনের সি৯১৯, বোয়িং-এয়ারবাসকে চ্যালেঞ্জের পথে কোমাক

আন্তর্জাতিক আকাশে চীনের সি৯১৯, বোয়িং-এয়ারবাসকে চ্যালেঞ্জের পথে কোমাক

  • শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১৯:০৩
  • ৮

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বৈশ্বিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়েছে চীনের তৈরি সি৯১৯। প্রথমবারের মতো চীনের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কমার্শিয়াল এয়ারক্রাফট করপোরেশন অব চায়না বা কোমাকের তৈরি এই উড়োজাহাজ।

বুধবার চীনের এয়ার চায়না পরিচালিত একটি সি৯১৯ বেইজিং থেকে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুর ৩টার কিছু পর বেইজিং ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে যাত্রা শুরু করে বিমানটি। প্রায় ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট পর উলানবাটরে পৌঁছায়। চীনের তৈরি এই ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের জন্য এটিই দেশের বাইরে প্রথম নির্ধারিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যাত্রীসেবা।

এয়ার চায়না জানিয়েছে, বেইজিং-উলানবাটর রুটে সি৯১৯ নিয়মিতভাবে প্রতিদিন চলাচল করবে। ফলে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজারে চীনের নিজস্ব যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের প্রবেশের ক্ষেত্রে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বোয়িং-এয়ারবাসের বাজারে চীনের চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের বাজারে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং ও ইউরোপের এয়ারবাসের আধিপত্য রয়েছে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে দীর্ঘদিন ধরেই নিজস্ব বিমান তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলছে চীন।

সি৯১৯ সেই প্রচেষ্টার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল। সর্বোচ্চ ১৭৪ জন যাত্রী পরিবহনে সক্ষম একক-আইল বা ন্যারো-বডির এই বিমানটি মূলত বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স এবং এয়ারবাস এ৩২০নিও-এর মতো জনপ্রিয় উড়োজাহাজের বাজারকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে।

চীনের জন্য সি৯১৯-এর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু হওয়া শুধু একটি নতুন বিমান রুট চালুর ঘটনা নয়। বরং এটি বৈশ্বিক বিমান শিল্পে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।

এখনো বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল সি৯১৯

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের এই সাফল্যের পাশাপাশি সি৯১৯-এর সামনে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিমানটি এখনো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি যন্ত্রাংশের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।

বিশেষ করে এর ইঞ্জিন তৈরি করে সিএফএম ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের জিই অ্যারোস্পেস এবং ফ্রান্সের সাফ্রান এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনসের যৌথ উদ্যোগ।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা করতে হলে কোমাককে শুধু বিমান তৈরি করলেই চলবে না। সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, উৎপাদনের গতি বাড়ানো এবং বিভিন্ন দেশে বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাও জরুরি।

এ ছাড়া সি৯১৯ এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রধান এভিয়েশন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন পায়নি। ফলে বিশ্বের বড় বড় আন্তর্জাতিক বাজারে বিমানটির প্রবেশের সুযোগ আপাতত সীমিত।

উৎপাদনের গতিও বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের আরেকটি উদ্বেগ হলো সি৯১৯-এর উৎপাদন সক্ষমতা। জার্মানির মারকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস মিশারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ কোমাক মোট ৩২টি সি৯১৯ সরবরাহ করেছিল। একই সময়ে শুধু ২০২৫ সালেই এয়ারবাস চীনে প্রায় ১০০টি ন্যারো-বডি বিমান সরবরাহ করে।

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে কোমাক আরও আটটি সি৯১৯ সরবরাহ করেছে বলে মিশার উল্লেখ করেছেন। অথচ ২০২৯ সালের মধ্যে বছরে ২০০টি বিমান উৎপাদনের যে লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে, সেখানে পৌঁছাতে উৎপাদনের গতি আরও অনেক বাড়াতে হবে।

অবসরপ্রাপ্ত এভিয়েশন বিশ্লেষক রব মরিসের মতে, বোয়িং ও এয়ারবাসের সঙ্গে প্রকৃত প্রতিযোগিতায় যেতে হলে কোমাকের উন্নয়ন ও উৎপাদনের গতি আরও দ্রুত করতে হবে। শুধু উড়োজাহাজ তৈরি করে বাজারে সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়; বিমান সংস্থাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তাও দিতে হবে।

যাত্রী ও এয়ারলাইনগুলোর আস্থা গুরুত্বপূর্ণ

একটি নতুন বিমান আন্তর্জাতিক বাজারে সফল করতে যাত্রী ও বিমান সংস্থাগুলোর আস্থা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোয়িং ও এয়ারবাসের বিমানগুলো বহু বছর ধরে বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইনগুলোর বহরে রয়েছে। ফলে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং কারিগরি সহায়তার একটি প্রতিষ্ঠিত কাঠামো রয়েছে।

সি৯১৯-এর ক্ষেত্রে সেই অবকাঠামো এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে বিমানটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কোমাককে দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি বিমানের সামান্য কোনো যন্ত্রাংশের সরবরাহে সমস্যা হলেও পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তাই কোমাকের জন্য শক্তিশালী ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

তবু বড় অর্জন চীনের

সব সীমাবদ্ধতার পরও সি৯১৯ চীনের বিমান ও মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ একটি আধুনিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ তৈরি করতে বিপুলসংখ্যক যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার ও জটিল প্রযুক্তি একসঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এত জটিল একটি পণ্য তৈরি ও পরিচালনার সক্ষমতা বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অর্জন করতে পেরেছে। সেই তালিকায় নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার পথে চীনের জন্য সি৯১৯ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

চীন বিশ্বের অন্যতম বড় এভিয়েশন বাজার হওয়ায় নিজ দেশেই কোমাকের বড় একটি সম্ভাব্য গ্রাহকভিত্তি রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বোয়িং ও এয়ারবাসকে সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জ করতে হলে উৎপাদন বাড়ানো, বিদেশি যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা কমানো, আন্তর্জাতিক অনুমোদন অর্জন এবং বিশ্বব্যাপী সেবা কাঠামো গড়ে তোলার মতো একাধিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

সব মিলিয়ে, সি৯১৯-এর প্রথম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট চীনের জন্য একটি প্রতীকী ও কৌশলগত সাফল্য। তবে বোয়িং ও এয়ারবাসের দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভাঙতে চীনের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। আন্তর্জাতিক আকাশে সি৯১৯-এর এই যাত্রা সেই দীর্ঘ প্রতিযোগিতারই সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15316 ,   Print Date & Time: Saturday, 15 August 2026, 02:52:30 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh