• হোম > বিদেশ > ইরানের বিরুদ্ধে এবার অর্থনৈতিক যুদ্ধ জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের বিরুদ্ধে এবার অর্থনৈতিক যুদ্ধ জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র

  • শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১৮:২৪
  • ১১

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

ইরানের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি এবার অর্থনৈতিক চাপও আরও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে তেহরানকে চাপ দিতে নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ এবং আর্থিক চাপ বাড়ানোর পথে হাঁটছে ওয়াশিংটন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলের পেছনে শুধু ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করার লক্ষ্যই কাজ করছে না বলে মনে করছেন কয়েকজন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক। দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল নির্দেশিত গোলাবারুদের মজুতের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও কৌশল পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিফর্ম প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যান গ্রেজিয়ার আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা হলেও তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে।

কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা ইরানের

গ্রেজিয়ারের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই ইরান বিভিন্ন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা দেশটির রয়েছে। ফলে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলেই ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

তিনি আরও মনে করেন, দীর্ঘ সময়ের সামরিক অভিযান যে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, এখন অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে সেটি অর্জন করা সম্ভব হবে—এমন ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

সাবেক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তা গ্রেজিয়ারের মতে, সামরিক অভিযান থেকে অর্থনৈতিক চাপের দিকে ওয়াশিংটনের ঝুঁকে পড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে দীর্ঘপাল্লার অস্ত্রের মজুত নিয়ে তৈরি হওয়া চাপ।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন অস্ত্রের মজুত নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিলেও হাতে থাকা তথ্য-প্রমাণে দীর্ঘপাল্লার সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল নির্দেশিত গোলাবারুদের ওপর চাপের ইঙ্গিত রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানও অনেকাংশে দূরপাল্লার বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য স্ট্যান্ড-অফ অস্ত্রনির্ভর।

অস্ত্রের মজুত নিয়ে বিতর্ক

দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান চালিয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তাই একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে বড় পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করে মজুত আরও কমিয়ে ফেলার ঝুঁকি নিতে ওয়াশিংটন সতর্ক থাকতে পারে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করছে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, আগের প্রশাসনের সময় ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহের কারণে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে চাপ তৈরি হয়েছিল।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপকে সামরিক অভিযানের একটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার দিকে এগোচ্ছে—এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।

গত ১৩ আগস্ট মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখার সক্ষমতা ওয়াশিংটনের রয়েছে। একই সময়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে আরও অর্থনৈতিক চাপ ও নতুন নিষেধাজ্ঞার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।

ফলে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ বা অচল থাকলে শুধু ইরান নয়, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হরমুজকে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ ইরানের রয়েছে। প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে একদিকে ইরানের তেল রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দাম ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এই কারণেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মার্কিন প্রচেষ্টা এখন কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক লড়াইয়েও রূপ নিয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধে চাপ বাড়ছে

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। হরমুজে অচলাবস্থার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি, জ্বালানি সরবরাহ ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

দেশটির অর্থনীতিতে জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎ সংকট এবং মূল্যস্ফীতির চাপও রয়েছে। তবে এসব চাপ ইরানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং বিকল্প আর্থিক ও তেল বিক্রির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তেহরান দীর্ঘস্থায়ী চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

সামরিক অভিযান থেকে অর্থনৈতিক চাপে কেন যুক্তরাষ্ট্র

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় দুটি ঝুঁকি রয়েছে। সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখলে ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল গোলাবারুদের মজুতের ওপর আরও চাপ পড়বে এবং যুদ্ধের ব্যয় বাড়বে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

হরমুজের ভৌগোলিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সরু এই জলপথে ইরানের উপকূল ও দ্বীপগুলো থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মাইন ও ছোট নৌযানের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরি করা সম্ভব।

ফলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে একবার হরমুজ খুলে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। এ কারণেই নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও আর্থিক চাপের মাধ্যমে ইরানের তেল আয় কমিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশলকে গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইরানের ওপর কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করলেও তেহরানকে নীতিগতভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। ফলে এবারও অর্থনৈতিক চাপ কত দ্রুত কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল এনে দেবে, তা অনিশ্চিত।

সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের তেল আয় কমানো এবং তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানো এর প্রকাশ্য লক্ষ্য। এর পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের ওপর তৈরি হওয়া চাপও কৌশল পরিবর্তনের একটি কারণ হতে পারে। তবে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক কৌশলের একমাত্র বা নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15298 ,   Print Date & Time: Sunday, 16 August 2026, 03:55:35 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh