• হোম > বিদেশ > ৩ লাখ ৮ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত মিয়ানমার

৩ লাখ ৮ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত মিয়ানমার

  • শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৪
  • ৫৩

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকার। রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়া এসব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।

শনিবার (১৫ আগস্ট) রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের নবম বছরে পদার্পণের দিনে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানায়।

মিয়ানমারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা থেকে গত জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। এ ছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনকে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ কর্মকাণ্ডে জড়িত হিসেবে শনাক্ত করার দাবি করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রত্যাবাসন

বিবৃতিতে মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল হলে যাচাই করা সাবেক বাসিন্দাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে ঢাকার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাবে তারা।

তবে প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানায়নি মিয়ানমার।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১৮ সালে দুই দেশ দুই বছর মেয়াদি প্রত্যাবাসন চুক্তিতে সই করলেও বাস্তবে বড় পরিসরে কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারেননি।

২০১৭ সালের পর বাংলাদেশে আসে লাখো রোহিঙ্গা

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে একটি রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠী কয়েকটি সীমান্ত চৌকিতে হামলা চালানোর পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই অভিযানের সময় প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

এর আগে কয়েক দশক ধরেও মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে ২০১৭ সালের অভিযানের পর একসঙ্গে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

অভিযানের ব্যাপকতা, সংগঠিত ধরন ও সহিংসতার কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পক্ষ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন ও গণহত্যার অভিযোগ তোলে।

মিয়ানমার অবশ্য রোহিঙ্গাদের দেশটির স্বীকৃত ১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটির সরকারি ভাষ্যে তাদের প্রায়ই ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সামরিক অভ্যুত্থানের পর আরও জটিল প্রত্যাবাসন

২০১৮ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির পরও রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলে দেশজুড়ে সামরিক শাসনবিরোধী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।

এর ফলে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয় এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ কার্যত থমকে যায়।

এরপর ২০২৩ সালে রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হয়। অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা এই যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় প্রত্যাবাসনের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

শরণার্থী শিবিরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতিও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, জীবনযাত্রার নানা সংকট এবং মিয়ানমারে নিরাপদে ফেরার অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ পথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

অনেকেই নৌকায় করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে সমুদ্রপথে যাত্রা করছেন। এতে প্রাণহানি ও মানবপাচারের ঝুঁকিও বাড়ছে।

এদিকে জুলাইয়ের শেষ দিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, প্রত্যাবাসন কর্মসূচির আওতায় মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে।

তবে পরে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং এপিকে জানান, ওই উদ্যোগ মালয়েশিয়ার ডিটেনশন সেন্টারে আটক ও যাচাই করা মিয়ানমারের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে—এমন খবরও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। মিয়ানমারের সর্বশেষ বক্তব্যে যাচাই করা রোহিঙ্গাদের ফেরানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15292 ,   Print Date & Time: Friday, 2 October 2026, 01:03:51 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh