![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
রাজশাহীর পুঠিয়ায় এইচএসসি পরীক্ষার খাতায় মোবাইল নম্বর লিখে আসার পর সেই নম্বরে যোগাযোগ করে এক পরীক্ষার্থীকে বাসায় ডেকে নিয়ে ফের খাতা লেখার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক পরীক্ষকের বিরুদ্ধে। এ জন্য ওই পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে রাজশাহী নগরীর আইডিয়াল ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানকে এভাবে ইংরেজি পরীক্ষার খাতা পুনরায় লেখার সুযোগ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় পরীক্ষক ও ওই শিক্ষার্থীর কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ডও পাওয়া গেছে।
মেহেদী হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে মোবাইল ফোনে পরীক্ষকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। এ সময় পরীক্ষক তাঁকে টাকা নিয়ে আসতে বলেন এবং বিষয়টি যেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানতে না পারেন, সে বিষয়ে সতর্ক করেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে পরীক্ষক বলেন, ‘একজন ভিক্ষুকের কাছেও দুই-দশ-বিশ হাজার টাকা থাকে।’ জবাবে মেহেদী জানান, তিনি বেকার হওয়ায় তাঁর কাছে এত টাকা থাকা কঠিন।
পরে ওই পরীক্ষক মেহেদীকে আরও কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে আসতে বলেন। তখন মেহেদী জানান, তাঁরা আপাতত যত টাকা সম্ভব নিয়ে আসবেন এবং অতিরিক্ত টাকা প্রয়োজন হলে ফল প্রকাশের পর দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
মেহেদীর দাবি, ইংরেজি পরীক্ষার খাতায় প্রথমে তাঁর নম্বর ছিল ২৫। পরীক্ষককে ২ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাঁকে আবার খাতাটি লিখতে দেওয়া হয়। এ সময় আগের ভুলগুলো সংশোধন করার পাশাপাশি যেসব প্রশ্নের উত্তর তিনি দেননি, সেগুলোর উত্তরও খাতার ফাঁকা জায়গায় লেখেন। এরপর তাঁর নম্বর ৫০-এর বেশি হবে বলে পরীক্ষক জানিয়েছেন বলে দাবি করেন মেহেদী।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মেহেদী বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে পরীক্ষকের সঙ্গে কথা বলার পর শুক্রবার ভোরে তিনি রাজশাহী নগরীর বিনোদপুর এলাকায় যান। সেখানে ইমন আলী, সৌরভ, রুহুল, সোহাগ ও সামিসহ মোট আটজন পরীক্ষার্থী অপেক্ষা করছিলেন। কিছুক্ষণ পর মোটরসাইকেলে করে ওই পরীক্ষক সেখানে আসেন। তিনি মেহেদী ও রুহুলকে মোটরসাইকেলে তুলে নিজের বাসায় নিয়ে যান।
প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর তাঁরা একটি টিনশেড বাড়িতে পৌঁছান বলে জানান মেহেদী। সেখানে পরীক্ষক ইংরেজি বিষয়ের খাতা বের করে দেন। খাতায় মেহেদীর মোবাইল নম্বর লেখা থাকায় সেটি সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তবে রুহুলের খাতা সেখানে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
মেহেদীর ভাষ্য, পরীক্ষকের নির্দেশে তাঁর ও রুহুলের মোবাইল ফোন এয়ারপ্লেন মোডে রাখতে হয়। খাতায় লেখা শেষ করার পর পরীক্ষক মেহেদীর মোবাইল ফোন থেকে নিজের নম্বর মুছে দেন। এরপর তাঁদের আবার বিনোদপুর এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
এদিকে দীর্ঘ সময় ধরে মেহেদী ও রুহুলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁদের সহপাঠীরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে পরীক্ষকের বাসায় গিয়ে খাতা লেখার বিষয়টি জানতে পারেন তাঁরা।
মেহেদীর সহপাঠী ইমন আলী বলেন, পরীক্ষকের নাম ও পরিচয় তাঁরা নিশ্চিতভাবে জানেন না। তবে তাঁকে দেখলে চিনতে পারবেন। তাঁর দাবি, পরীক্ষক মেহেদীর মোবাইল ফোন থেকে নিজের নম্বর মুছে দিয়েছেন। একই সঙ্গে আরও কয়েকজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করতে পারবেন না জানিয়ে তাঁদের খাতা দেখানোর জন্য পরবর্তী সময়ে মেহেদীর সঙ্গে আবার যোগাযোগ করবেন বলেও পরীক্ষক জানিয়েছেন।
পরীক্ষকের বাসা থেকে বের হওয়ার পর মেহেদী ও রুহুল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক নাহিদুল ইসলাম সাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁকে পুরো ঘটনা জানান তাঁরা।
নাহিদুল ইসলাম সাজু বলেন, একটি পাবলিক পরীক্ষার খাতা নিয়ে এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে বিষয়টি জানিয়েছেন। অভিযোগটি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন আইডিয়াল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল হামিদ। পরীক্ষার্থীদের নাম জানানো হলে তিনি বলেন, ফরম পূরণের তালিকা যাচাই করলে তাঁরা ওই কলেজের শিক্ষার্থী কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অভিযোগের বিষয়ে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান শামীম আরা চৌধুরী বলেন, চাকরিজীবনে তিনি এমন ঘটনার কথা শোনেননি। অভিযোগটি সত্য হলে এটি অত্যন্ত গুরুতর ও ভয়াবহ ঘটনা। কোনোভাবেই এমন অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, গত ৮ আগস্ট এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালীনই পরীক্ষার্থীদের খাতা পরীক্ষকদের কাছে পাঠানো শুরু হয়েছিল। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীন বিভিন্ন জেলার পরীক্ষকদের কাছেই এসব খাতা যেতে পারে। কোন খাতা কোন পরীক্ষকের কাছে পাঠানো হয়েছে, তা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানেন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষককে শনাক্ত করা গেলে ঘটনাটি পাবলিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার জন্য গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।