![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার নিউইয়র্কে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের মালিকানা দাবি করবে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে যাতায়াত করত। ফলে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিউইয়র্কে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরান এরই মধ্যে সামরিকভাবে ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইরানকে পরাজিত করার পর তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করবেন বলেও মন্তব্য করেন।
তবে আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক বাস্তবতার দিক থেকে ট্রাম্পের এমন দাবি নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালির বড় অংশ আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হলেও এর দুই পাশে ইরান ও ওমানের ভূখণ্ড রয়েছে। নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তেহরানের দাবি, প্রণালির একটি অংশ তাদের আঞ্চলিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। ফলে ওই এলাকায় নিজেদের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে বলে মনে করে ইরান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অবরোধ জোরদার করেছে। চলতি সপ্তাহে ইরানি বন্দরে যাওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগে একটি কার্গো জাহাজে মার্কিন বাহিনী গুলি চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুক্রবার আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে ট্রাম্প মার্কিন অবরোধকে ‘অপ্রতিরোধ্য’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র যা করছে তা শুধু নিজেদের স্বার্থে নয়, বরং বিশ্বের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, কোনো বক্তব্য, বিমানবাহী রণতরি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা সম্ভব নয়। ইরান কোনো হুমকিতে ভয় পায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ কেবল সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি দুই দেশের চলমান কূটনৈতিক আলোচনারও অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে জুনে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার শর্তও ছিল।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। এর পর আবারও সংঘাত বাড়তে শুরু করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নৌপথটি দীর্ঘ সময় বন্ধ বা সীমিত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং খাদ্য ও পণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিরোধিতা রয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ মার্কিন ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতের ওপর চাপ এবং অভ্যন্তরীণ জনমতের বিরোধিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এর মধ্যেই ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালিকে মার্কিন অঞ্চল ঘোষণার মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন বক্তব্য ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা বাড়ানোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।