• হোম > বাংলাদেশ > উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারদের কর-ভ্যাট যাচাইয়ে এনবিআরের অভিযান

উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারদের কর-ভ্যাট যাচাইয়ে এনবিআরের অভিযান

  • শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:০০
  • ৬৯

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে কর ও ভ্যাট পরিশোধ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বড় পরিসরে অনুসন্ধান শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত ও আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রকল্পভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করছে সংস্থাটির সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)।

এর অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও অধিদপ্তরের কাছে চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রধান প্রকৌশলীর কাছে এ ধরনের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সিআইসি।

চিঠিতে প্রতিটি চলমান প্রকল্পের নাম, প্রকল্পের ধরন, উন্নয়ন সহযোগীর নাম, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, প্রতিষ্ঠানের বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন), ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন), প্রকল্পের মোট ব্যয় এবং প্রকল্প শুরুর তারিখসহ বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়েছে।

সিআইসি জানিয়েছে, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কিছু ঠিকাদার যথাযথভাবে সরকারি রাজস্ব জমা দিচ্ছেন না। অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতেই প্রকল্প ও ঠিকাদারভিত্তিক এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এনবিআরের অনুসন্ধানে মূলত সরকারি প্রকল্পে ব্যয় হওয়া অর্থের বিপরীতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে সরকারের প্রাপ্য কর ও ভ্যাট যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হবে। এ জন্য প্রকল্পের মোট ব্যয়, ঠিকাদারের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর ও ভ্যাট নিবন্ধনের তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

সিআইসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোনো প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে এবং সেই প্রকল্পে কাজ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিআইএন ও টিআইএন কী—এসব তথ্য যাচাই করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ও আয়কর-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে কর ও ভ্যাট ফাঁকির সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো শনাক্ত করা যাবে।

শুধু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর নয়, সরকারের অন্যান্য বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাছ থেকেও একই ধরনের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, রেলওয়ে, নৌপরিবহন, পানিসম্পদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্তসহ বিভিন্ন খাতের প্রকল্পও এই অনুসন্ধানের আওতায় আসছে।

সরকারের উন্নয়ন বাজেটের বড় একটি অংশ সড়ক, সেতু, রেলপথ, স্থানীয় অবকাঠামো, নৌপথ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যয় হয়। এসব প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল অর্থ পরিশোধ করা হয়। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে যথাযথ রাজস্ব আদায় হচ্ছে কি না, তা যাচাইকে গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এনবিআরের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আরও আগেই নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

তিনি মনে করেন, ঠিকাদারদের কর ও ভ্যাট পরিশোধের বিষয়টি শক্তিশালীভাবে যাচাই করা গেলে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাতের দুর্বলতা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে তদন্তে কর, ভ্যাট ও শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে এনবিআরের কোনো অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মত দিয়েছেন তিনি।

এদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চাপের মধ্যেই ঠিকাদারদের কর-ভ্যাট যাচাইয়ে এনবিআরের এই উদ্যোগ সামনে এলো। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে।

আগের অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এনবিআর ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল। একই সময়ে সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। ফলে ওই সময়ে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়ায় ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ের আকারও বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে কর ও ভ্যাট আদায় নিশ্চিত করা এনবিআরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আয়করের বড় একটি অংশ উৎসে ও অগ্রিম করের মাধ্যমে আদায় হয়। ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের সময় কেটে রাখা উৎসে করও এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। তবে সরকারি প্রকল্প থেকে আদায় করা এই করকে ঠিকাদারি খাতের মোট রাজস্ব হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, কারণ ঠিকাদারি ও সরবরাহ ব্যবসার সব লেনদেন সরকারি প্রকল্পনির্ভর নয়।

সব মিলিয়ে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে ঠিকাদারদের কর ও ভ্যাট পরিশোধের তথ্য মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত করতে চাইছে এনবিআর। অনুসন্ধানে অনিয়ম বা ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ সফল হলে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের বিপরীতে রাজস্ব আদায়ের পরিধিও আরও বাড়তে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15242 ,   Print Date & Time: Thursday, 1 October 2026, 05:12:40 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh