• হোম > রাজনীতি > রাজনীতির অভিধানে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটির অপব্যবহার

রাজনীতির অভিধানে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটির অপব্যবহার

  • বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৫৭
  • ৬৫

---

বিশেষ প্রিতিনিধি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু শব্দ কেবল শব্দকোষে থাকে না। সময়ের পরিক্রমায় এগুলো হয়ে ওঠে ক্ষমতার লড়াইয়ের অস্ত্র। বর্তমান রাজনীতিতে ‘ফ্যাসিস্ট’ তেমনই একটি শব্দ। প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে এই শব্দের ব্যবহার এখন বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিপক্ষকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বললেই কি সে রাতারাতি ফ্যাসিস্ট হয়ে যায়? নাকি দলের আচরণ ও কাজের মাধ্যমেই তার পরিচয় নির্ধারিত হওয়া উচিত?

সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। নির্বাচনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। জামায়াত নেতাদের মতে, বিএনপি একদলীয় শাসনের দিকে এগোচ্ছে। এনসিপির বক্তব্যেও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

নিঃসন্দেহে বিএনপি কোনো সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। নির্বাচিত সরকারও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না। ক্ষমতাসীন দল যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, তবে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যারা আজ অন্য দলকে ফ্যাসিবাদের পাঠ পড়াচ্ছে, তাদের নিজেদের অতীত ও বর্তমান কি খুব স্বচ্ছ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে জামায়াতের ইতিহাস এড়ানো যায় না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা অত্যন্ত বিতর্কিত। পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে দলটি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল।

আজ জামায়াত নিজেদের গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। রাজনীতিতে পুনর্গঠন অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাসের জবাবদিহি এড়িয়ে কেবল বর্তমানের কথা বলে অতীত মুছে ফেলা যায় না। তাছাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করেও দলটির বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছিল। অন্যের হিসাব চাওয়ার আগে নিজের খাতার হিসাব পরিষ্কার করা কি জরুরি নয়?

জামায়াতের রাজনৈতিক রূপান্তর কতটা বাস্তব, তা তাদের সামাজিক নীতিতেও স্পষ্ট হওয়া দরকার। সাম্প্রতিক সময়ে দলটি নারীর অধিকারের কথা বলছে। অথচ দলের এক শীর্ষ নেতার অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য ছড়ানোর পর হ্যাক হওয়ার কথা বলা হয়। কেবল নির্বাচনী ইশতেহারে সমান অধিকারের কথা বললেই আস্থার সংকট কাটে না।

পাশাপাশি রয়েছে বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু সুরক্ষার প্রশ্ন। বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী দেশ। জামায়াত যখন ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে, তখন সংখ্যালঘুদের মনে ভীতি তৈরি হয়। আধুনিক গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকারের পাশাপাশি সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাও সমান জরুরি।

নতুন শক্তি এনসিপির ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ভাষা কারও একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। জুলাইয়ের মূল শিক্ষা যদি আধিপত্য প্রত্যাখ্যান হয়, তবে তা কেবল এক দলকে সরিয়ে অন্য দলকে ক্ষমতায় বসানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিএনপির আধিপত্য যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি অন্য শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্যের আশঙ্কার বিরুদ্ধেও সজাগ থাকা দরকার।

ফ্যাসিবাদ কেবল একটি গালি নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো, যেখানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে। সুতরাং কোনো দলকে এই তকমা দেওয়ার আগে তার সামগ্রিক আচরণ বিশ্লেষণ করা আবশ্যক।

সবশেষে এটাই বলতে হয়, ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটিকে সস্তা স্লোগানে পরিণত করলে এর গুরুত্ব নষ্ট হয়। এর অর্থ এই নয় যে বিএনপিকে ছাড় দেওয়া হবে। বিএনপি ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাদের কঠোরভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। কিন্তু একই মানদণ্ড জামায়াত ও অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে হবে।

গণতন্ত্রের বড় সৌন্দর্য হলো—এখানে কেউ নৈতিকতার একচ্ছত্র মালিক নয়। জনগণ অন্ধ আনুগত্য চায় না, চায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। পরিশেষে জনগণই ঠিক করবে কোন দল প্রকৃত গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বেশি বিশ্বস্ত।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15232 ,   Print Date & Time: Tuesday, 29 September 2026, 11:56:12 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh