• হোম > উত্তর আমেরিকা | বিদেশ > নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ট্রাম্পকে সরানো হয় গোপনে, বিমানে ছিলেন দুই মন্ত্রী

নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ট্রাম্পকে সরানো হয় গোপনে, বিমানে ছিলেন দুই মন্ত্রী

  • বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৪:১২
  • ৫৬

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা থেকে গোপনে অন্য একটি সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়ার সময় একটি ছদ্মবেশী ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রেসিডেন্টকে বহনকারী মূল বিমান থেকে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার পরও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সেই ছদ্মবিমানেই থেকে গিয়েছিলেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, ইরান-সম্পর্কিত সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির কারণে গত ৮ জুলাই এই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওই সময় ট্রাম্পসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের একটি বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ হিসেবে আঙ্কারা থেকে যাত্রা করেছিল।

তবে বিমানটি উড্ডয়নের পর একটি খাবার সরবরাহকারী গাড়ির আড়াল ব্যবহার করে ট্রাম্পকে গোপনে অন্য একটি সামরিক বিমানে স্থানান্তর করা হয়। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে না দেওয়া এবং প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান গোপন রাখাই ছিল এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য।

কেন ছদ্মবিমানে রাখা হয়েছিল দুই মন্ত্রীকে?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে দ্বিতীয় বিমানে সরিয়ে নেওয়ার পর মার্কো রুবিও ও স্কট বেসেন্ট প্রথম বিমানেই থেকে যান। এর পেছনে ছিল মার্কিন সরকারের সাংবিধানিক ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোনো কারণে মারা গেলে কিংবা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে নির্ধারিত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রথমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরপর প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার, সিনেটের প্রেসিডেন্ট প্রো টেম্পোর এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী উত্তরাধিকার তালিকায় রয়েছেন।

সুতরাং ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকারের নেতৃত্বের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে, সে কারণেই রুবিও ও বেসেন্টকে প্রথম বিমানে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান গোপন রাখা হয়

৮ জুলাইয়ের ওই অভিযানে ট্রাম্প প্রথমে রুবিও, বেসেন্ট এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ ওঠেন। পরে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের আড়াল ব্যবহার করে তাকে গোপনে অন্য একটি সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়।

দ্বিতীয় বিমানটিতে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, তার নির্বাহী সহকারী ন্যাটালি হার্প, হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা ড্যান স্ক্যাভিনো এবং ওভাল অফিসের কার্যক্রমবিষয়ক পরিচালক ওয়াল্ট নাউটা।

অন্যদিকে প্রথম বিমানটিতে থেকে যান রুবিও ও বেসেন্ট। তাদের সঙ্গে ছিলেন হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা স্টিফেন মিলার এবং যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিউং।

বিমানে থাকা সাংবাদিকদের কাছেও যে তারা একটি ছদ্মবিমানে অবস্থান করছেন, সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

নিরাপত্তা হুমকি কতটা গুরুতর ছিল?

ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, তার নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, নিরাপত্তা কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন তিনি যেন অন্য একটি বিমানে ভ্রমণ করেন।

তবে ঠিক কী ধরনের হুমকি শনাক্ত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। তিনি শুধু বলেছেন, একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি নিয়মিতই নানা ধরনের হুমকি পান।

তবে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য হুমকির মধ্যে কাঁধে বহনযোগ্য ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ম্যান-পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের (MANPADS) আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।

এ ছাড়া ইরানি পক্ষ ট্রাম্পের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানত কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ ছিল বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এমনকি তিনি যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন, তার কোন তলায় ছিলেন—সেই তথ্যও সম্ভাব্য হামলাকারীদের জানা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

আঙ্কারায় ক্ষেপণাস্ত্রের আশঙ্কা

নিউইয়র্ক টাইমস অজ্ঞাতনামা মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনকে ঘিরে একজন ব্যক্তিকে বহনযোগ্য ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করতে দেখা গিয়েছিল।

এই তথ্যের সঙ্গে ট্রাম্পের গোপন বিমান পরিবর্তনের ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক কতটা ছিল, তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে উচ্চঝুঁকির পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের অবস্থান গোপন রাখার জন্য মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলো যে অত্যন্ত সতর্ক ছিল, তা স্পষ্ট।

এদিকে রুবিও, বেসেন্টসহ প্রথম বিমানে থাকা অন্য কর্মকর্তা এবং বিমানবাহিনীর সদস্যরা পুরো অভিযানের পরিকল্পনা সম্পর্কে কতটা জানতেন, সেটিও পরিষ্কার নয়।

‘খোলস বদলের’ কৌশল নতুন নয়

প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় এমন বিভ্রান্তিমূলক কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কিছু নয়। গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এ ধরনের পদ্ধতিকে অনেক সময় ‘খোলস বদলের খেলা’ হিসেবে বিবেচনা করেন।

প্রেসিডেন্টকে বহনকারী গাড়িবহরে একই ধরনের একাধিক সুরক্ষিত গাড়ি ব্যবহার করে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করা হতে পারে। একইভাবে প্রেসিডেন্টকে বহনকারী হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিভ্রান্তিমূলক কৌশল প্রয়োগ করা হয়।

বিদেশ সফরের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ দেশে প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান ও চলাচলের তথ্য গোপন রাখা নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ক্লিনটনের সফরেও ব্যবহার হয়েছিল ছদ্মবিমান

এ ধরনের কৌশলের নজির অতীতেও রয়েছে। ২০০০ সালের মার্চে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ সফরের সময় একটি পরিচয়বিহীন সরকারি বিমানে সেখানে পৌঁছেছিলেন।

এর আগে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর মতো বাহ্যিক নকশার একটি ছদ্মবিমান ইসলামাবাদে অবতরণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে সম্ভাব্য হুমকিদাতাদের বিভ্রান্ত করা।

সেই সফরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা সম্পর্কে সে সময়ের হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা সমিতির প্রধান ও ইউএসএ টুডের সাংবাদিক সুসান পেজকে আগেই জানানো হয়েছিল। তিনি পরে জানান, সফরটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ছদ্মবিমান ব্যবহারের বিষয়টিও তাকে জানানো হয়েছিল।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও তথ্য প্রকাশ নিয়েও প্রশ্ন

তুরস্ক সফরের ঘটনায় আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ছদ্মবিমানে থাকা সাংবাদিকরা আদৌ কোনো ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন কি না এবং তাদের নিরাপত্তা সম্পর্কে কতটা তথ্য জানানো হয়েছিল।

হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের অ্যাসোসিয়েশন এ ঘটনায় প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। তবে সংগঠনটির সভাপতি জ্যাকুই হাইনরিখ জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তিনি প্রেসিডেন্টের স্বাধীন সংবাদ কাভারেজ এবং তার চলাচলের একটি নির্ভুল ঐতিহাসিক রেকর্ড সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের কীভাবে অবহিত করা হবে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে একটি সুস্পষ্ট নিয়ম বা প্রটোকল তৈরির আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের সময় ছদ্মবিমান ব্যবহার এবং প্রেসিডেন্টকে গোপনে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জটিলতা আবারও সামনে এনেছে। তবে সেই সময়ের প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকি কী ছিল এবং অভিযানে জড়িত সবাই কতটা তথ্য জানতেন, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15212 ,   Print Date & Time: Monday, 28 September 2026, 01:58:13 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh