• হোম > অর্থনীতি > বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ নেবে

বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ নেবে

  • বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৫৮
  • ৫২

---

আহমেদ তোফায়েল

বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ার বড় আশা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি আমেরিকান চেম্বার (অ্যামচেম) নেতারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার নতুন বিনিয়োগ আনতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে প্রশ্ন হলো, এই বিশাল বিনিয়োগ কি কেবল প্রতিশ্রুতির কাগজেই থাকবে? নাকি তা দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে।

বিগত বছরগুলোতে অ্যামচেমের সদস্যরা বাংলাদেশে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছেন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন অনেক দেশ বিনিয়োগ টানতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন আরও পাঁচশ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে।

এই আস্থার পেছনে রয়েছে সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ। নির্দিষ্ট সময়ে লাইসেন্স দেওয়া, সিঙ্গেল উইন্ডো পদ্ধতি চালু করা, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ ব্যবসায়িক মহলে স্বস্তি ফিরিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের অভিযোগ করতেন। বর্তমান প্রশাসনের সংস্কারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি সেই জটিলতা অনেকটাই দূর করছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন শুধু তৈরি পোশাক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন এক বহুমাত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অ্যামচেমের সঙ্গে আলোচনায় ভবিষ্যতের অনেক দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে। এই বিনিয়োগ কেবল চিরায়ত উৎপাদন খাতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নত উৎপাদনব্যবস্থার মতো উচ্চপ্রযুক্তির খাতে।

আমাদের একবিংশ শতাব্দীতে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দরকার। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির কাঠামোকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বিনিয়োগ যদি প্রযুক্তি ও ডিজিটাল উদ্ভাবনের খাতে আসে, তবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে শক্তিশালী অবস্থান পাবে। এতে তৈরি হবে উচ্চমূল্যের নতুন কর্মসংস্থান।

বিনিয়োগ আকর্ষণের সবচেয়ে বড় বাধা হলো নীতিগত অস্পষ্টতা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নীতির হুট করে বদলে যাওয়া বিনিয়োগকারীদের ভয় দেখায়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সবসময় দীর্ঘমেয়াদী হিসাব করে পুঁজি খাটান। আজ যে নীতিতে তারা বিনিয়োগ করছেন, আগামী পাঁচ বছর পরেও তা থাকবে কি না, তারা তা জানতে চান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সঠিকভাবেই বলেছেন, নীতির স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়। অতীতে অনেক ভালো উদ্যোগও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতায় নষ্ট হয়েছে। বর্তমান সরকার সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করাটাই এখন আসল চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারীরা মুখের আশ্বাসের চেয়ে কাজের বাস্তবায়ন দেখতে চান বেশি।

অ্যামচেমের পক্ষ থেকে কমপ্লায়েন্সের চাপ কমানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মূলধন ও মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া উন্নত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন মুনাফা নিজ দেশে নিতে যান, তখন নানা ব্যাংকিং জটিলতায় পড়েন। এই প্রক্রিয়াগুলো যতো সহজ হবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ততোই বাড়বে।

পাশাপাশি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমে গতি আনা জরুরি। কাস্টমস ও ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। এতে ব্যবসার খরচ কমবে। খরচ কমলে দেশি ও বিদেশি উভয় ধরনের উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যোগে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হবেন।

এখানে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের পূর্বশর্ত হলো সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। এটি একটি ইতিবাচক লক্ষণ। সরকারের নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীরা নিয়মিত আলোচনা করলে মাঠের সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।

এছাড়াও, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা খুব জরুরি। দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যোক্তারা প্রায়ই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে পড়েন। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে সরকারের নীতিগত সহায়তা দরকার। আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত না করা গেলে বড় বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

ভবিষ্যৎ করণীয় কী :

অ্যামচেমের ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সহায়তার প্রতিশ্রুতি অর্থনৈতিক কূটনীতির এক বিরাট সাফল্য। তবে এই প্রতিশ্রুতি যেন শুধু খবরের কাগজেই না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, বিনিয়োগ বোর্ডের ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে পুরোপুরি কার্যকর করতে হবে। সব অনুমোদন এক ছাদের নিচে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা চিরতরে দূর করতে হবে। তৃতীয়ত, শ্রমবাজারের মান উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনাময় এক দেশ। উপযুক্ত নীতি, সুশাসন ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারলে এই বিনিয়োগ দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15208 ,   Print Date & Time: Monday, 28 September 2026, 12:20:12 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh