• হোম > বাংলাদেশ > জুলাই-জুন বদলে এপ্রিল-মার্চ, অর্থবছর পরিবর্তনের উদ্যোগ সরকারের

জুলাই-জুন বদলে এপ্রিল-মার্চ, অর্থবছর পরিবর্তনের উদ্যোগ সরকারের

  • বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৩৬
  • ৫৪

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বাংলাদেশের প্রচলিত জুলাই-জুন অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তন করে এপ্রিল-মার্চ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে শিগগিরই মন্ত্রিসভায় একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করা হতে পারে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে প্রয়োজনীয় আইন, বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাবরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় সংশোধন এনে নতুন অর্থবছরের কাঠামো কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নির্দেশে অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা শুরু করেছে বাজেট অনুবিভাগ। নতুন সময়সীমা চালু হলে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে, বর্তমানে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছর পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু জুলাই-জুনের পরিবর্তে এপ্রিল-মার্চ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সরকারি বাজেট, কর ব্যবস্থা, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট, হিসাবরক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ক্রয় এবং বিভিন্ন আর্থিক সফটওয়্যারের সময়সূচিও নতুন করে সাজাতে হবে।

কেন এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের কথা ভাবছে সরকার

বাংলাদেশে বর্তমানে অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই এবং শেষ হয় ৩০ জুন। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও ঠিকাদারি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এই সময়সীমা পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

এর অন্যতম প্রধান কারণ বাংলাদেশের আবহাওয়া। অর্থবছরের শেষ তিন মাস—এপ্রিল, মে ও জুন—দেশে সাধারণত বৃষ্টি ও বর্ষার প্রভাব বাড়তে থাকে। ফলে সড়ক, সেতু, পানি উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়।

বিশেষ করে জুন মাসে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় এবং প্রকল্পের কাজ শেষ করার চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হয়। এতে প্রকল্পের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়।

প্রস্তাবিত এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলে অর্থবছরের শেষ তিন মাস হবে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে বর্ষাকালের বড় অংশ অর্থবছরের শেষ প্রান্ত থেকে সরে যাবে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র, কার্যাদেশ, নির্মাণকাজ এবং বিল পরিশোধের সময়সূচি আরও বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।

একসঙ্গে চলবে দুই অর্থবছরের কার্যক্রম

নতুন অর্থবছর চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বর্তমান অর্থবছর থেকে নতুন সময়সীমায় রূপান্তর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছর কীভাবে শেষ করা হবে এবং কোন সময় থেকে নতুন অর্থবছর কার্যকর হবে, সে বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের মতামত নেওয়া হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের এপ্রিল, মে ও জুন—এই তিন মাসে পুরোনো ও নতুন অর্থবছরের কিছু কার্যক্রম পাশাপাশি চলতে পারে। এ জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।

বর্তমানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জুলাই-জুন সময়সীমা অনুসরণ করে কার্যকর হয়েছে। এ বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে নতুন অর্থবছর চালু করতে চলমান বাজেটের হিসাব কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটি বড় একটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজস্ব ও কর ব্যবস্থায়ও আসবে পরিবর্তন

অর্থবছরের সময় পরিবর্তন হলে শুধু উন্নয়ন বাজেট নয়, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। আয়কর, ভ্যাট, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, সরকারি হিসাব, বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন আর্থিক সফটওয়্যারের হিসাবের সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।

এ ছাড়া মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর বার্ষিক কর্মসম্পাদন পরিকল্পনা, সরকারি ক্রয় পরিকল্পনা, প্রকল্পের অর্থছাড় এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির সময়সূচিও নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।

ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অর্থবছর পরিবর্তনকে কেবল ক্যালেন্ডারের তিন মাস এগিয়ে নেওয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দেশের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন।

উন্নয়ন প্রকল্পে কমতে পারে তড়িঘড়ি ব্যয়ের প্রবণতা

অর্থবছরের শেষদিকে সরকারি অর্থ ব্যয়ের চাপ বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করার জন্য অনেক সময় প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা হয়।

এতে প্রকল্পের গুণগত মান, ব্যয় এবং বাস্তবায়নের সময় নিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বর্ষাকালে নির্মাণকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, অর্থবছরের সময় এগিয়ে আনা হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

তার মতে, অর্থবছরের শেষ তিন মাসে বর্ষাকাল থাকায় অনেক প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়। আবার জুনে বিল পাওয়ার জন্য ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ দ্রুত শেষ করার প্রবণতা দেখা যায়। এতে কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অর্থের অপচয় হতে পারে।

তবে তিনি মনে করেন, শুধু অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করলেই সব সমস্যা সমাধান হবে না। প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড় এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায়ও সংস্কার প্রয়োজন।

২০১০ সালেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল

বাংলাদেশে অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ২০১০ সালেও অর্থবছর পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বিভিন্ন কারণে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো এবং অর্থের অপচয় কমানোর বিষয়টি সামনে আসায় আবারও অর্থবছরের কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সরকার ইতোমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি অনুযায়ী লাল, হলুদ ও সবুজ সংকেতের মাধ্যমে প্রকল্পগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করা হবে। এর মাধ্যমে কোন প্রকল্প পিছিয়ে আছে এবং কোথায় দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

ঠিকাদারি খাতেও বদলাবে কাজের সময়সূচি

অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ হলে সরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আসবে। দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ প্রদান, নির্মাণকাজের সময়সীমা এবং বিল পরিশোধের চক্র নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

বর্তমানে অর্থবছরের শেষদিকে অনেক প্রকল্পের বিল পরিশোধে চাপ তৈরি হয়। নতুন কাঠামো চালু হলে সেই চাপ মার্চ মাসকে কেন্দ্র করে তৈরি হতে পারে। তাই বছরের শুরুতেই প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সূচি আরও কার্যকরভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

এ ছাড়া যেসব প্রকল্পের মেয়াদ বর্তমানে জুলাই-জুন ভিত্তিক, সেগুলো কীভাবে নতুন এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছরের প্রস্তাবও ছিল

অর্থবছর পরিবর্তনের বিষয়ে রাজনৈতিক পর্যায়েও বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব এসেছে। ২০২৬ সালের বাজেট প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

দলটির প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটেও অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে আসে। জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার সময় দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করার পক্ষে মত দেন।

তার যুক্তি ছিল, বর্তমান ব্যবস্থায় অর্থবছরের শেষদিকে অনেক সময় প্রকল্পের কাজের চেয়ে বিল সম্পন্ন করার ওপর বেশি গুরুত্ব পড়ে। ফলে অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

শুধু সময় পরিবর্তনেই বন্ধ হবে না অপচয়

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ করা হলে কিছু সমস্যা কমতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে না।

প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়, ক্রয় ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।

এ ছাড়া প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা বাড়ানো জরুরি।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ব্যবস্থাকেও ধাপে ধাপে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে। একসঙ্গে সব পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও পরিকল্পিতভাবে এগোলে রূপান্তর প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের অর্থবছর জুলাই-জুন থেকে এপ্রিল-মার্চে পরিবর্তনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি বাজেট ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সরকারের প্রত্যাশা, এতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং অর্থবছরের শেষদিকে তড়িঘড়ি করে অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা কমবে।

তবে নতুন অর্থবছর কাঠামোর সুফল নিশ্চিত করতে হলে শুধু সময়সীমা পরিবর্তন নয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও সমন্বিত সংস্কার করতে হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15200 ,   Print Date & Time: Monday, 28 September 2026, 08:51:54 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh