![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে দেশে ডিজিটাল লেনদেন আরও বাড়াতে বাংলা কিউআর (Bangla QR) ব্যবস্থায় ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি বা P2P (Person-to-Person) লেনদেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই সুবিধা চালু হলে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) ও পেমেন্ট সার্ভিস অপারেটরের (পিএসও) গ্রাহকেরা কিউআর কোড ব্যবহার করে একে অন্যকে সহজে টাকা পাঠাতে পারবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৩১ অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে নিজেদের অ্যাপে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধা যুক্ত করতে হবে। এরপর ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি লেনদেন চালুর জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট নম্বর, রাউটিং নম্বর কিংবা অন্যান্য তথ্য বারবার হাতে লিখে দেওয়ার প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে ভুল অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যাওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ ও নিরাপদ করার সুযোগ তৈরি হবে।
যেভাবে কাজ করবে বাংলা কিউআর-এর P2P লেনদেন
বর্তমানে বাংলা কিউআর মূলত দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পণ্য ও সেবা কেনার অর্থ পরিশোধে ব্যবহৃত হচ্ছে। একজন ক্রেতা দোকানির কিউআর কোড স্ক্যান করে নিজের ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ থেকে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করেন। এটিকে মূলত কাস্টমার-টু-মার্চেন্ট বা C2M লেনদেন বলা হয়।
নতুন ব্যবস্থায় একই প্রযুক্তি ব্যক্তি পর্যায়েও ব্যবহার করা যাবে।
উদাহরণ হিসেবে, ঢাকায় থাকা কোনো বাবা যদি অন্য শহরে থাকা সন্তানের কাছে টাকা পাঠাতে চান, তাহলে সন্তান নিজের অ্যাপ থেকে একটি P2P বাংলা কিউআর কোড তৈরি করে বাবার কাছে পাঠাতে পারবেন। বাবা সেই কিউআর কোড স্ক্যান করেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাঠাতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব নম্বর বা অন্যান্য দীর্ঘ তথ্য টাইপ করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। ফলে দ্রুত ও তুলনামূলক সহজ উপায়ে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের পরিচালক শরফত উল্লাহ খান জানিয়েছেন, বাংলা কিউআরকে একটি একক ও সর্বজনীন কিউআর কোড ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য সামগ্রিকভাবে কাজ করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
বাংলা কিউআরের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বাংলা কিউআর ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই ব্যবস্থায় ৭ লাখ ২৩ হাজার ৩৭৮টি লেনদেন হয়েছিল। এসব লেনদেনের মোট মূল্য ছিল প্রায় ২১২ কোটি ৫ লাখ টাকা।
ছয় মাস পর জুলাইয়ে লেনদেনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৩৮টিতে। একই সময়ে লেনদেনের মোট মূল্য বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুলাই—মাত্র ছয় মাসে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ৮ দশমিক ৬ গুণ এবং মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৭ গুণ বেড়েছে।
শুধু লেনদেনের সংখ্যা নয়, বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্টের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে বাংলা কিউআর মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৭১২। জুনে তা বেড়ে ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৮৮ এবং জুলাইয়ে প্রায় ২৪ লাখ ২৫ হাজার ১৩৩-এ পৌঁছেছে।
মার্চেন্ট পেমেন্টে শূন্য চার্জ
ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করতে বাংলা কিউআরভিত্তিক মার্চেন্ট পেমেন্টে আন্তঃব্যাংক চার্জ বা ইন্টারচেঞ্জ রিমবার্সমেন্ট ফি শূন্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে সংশ্লিষ্ট লেনদেনে এ ধরনের চার্জ আদায়ের সুযোগ থাকবে না।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলও গঠন করেছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে এই তহবিলের পরিমাণ আরও বাড়ানো হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেশের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার। এখনো প্রায় ছয় কোটি মানুষ বাটন ফোন ব্যবহার করেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এই জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে কম দামে অ্যান্ড্রয়েড ফোন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিস্তিতে স্মার্টফোন কেনার সুযোগ তৈরির বিষয়েও কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও কর আদায়েও বাংলা কিউআর
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান মনে করেন, বাংলা কিউআরে ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি লেনদেন চালু হলে অনলাইন লেনদেনের পরিমাণ আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তার মতে, বর্তমানে কাউকে ‘সেন্ড মানি’ করার সময় একটি সংখ্যা ভুল হলে ভুল অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একক কিউআর ব্যবস্থায় এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের মতো ক্ষেত্রেও বাংলা কিউআর ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতে এসব সেবায় কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিপুল ব্যয়
বাংলাদেশে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টাকা ছাপানো, নিরাপত্তা ছাপাখানায় উৎপাদন, বাজারে সরবরাহ, মানুষের হাতে পৌঁছানো, নোটের ব্যবহার, নষ্ট বা ছেঁড়া নোট সংগ্রহ এবং শেষ পর্যন্ত তা ধ্বংস করার পুরো প্রক্রিয়ায় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।
এই ব্যয় কমানোর অন্যতম উপায় হিসেবে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ যত বাড়বে, নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা তত কমবে। এতে একদিকে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন আরও বাড়তে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি লেনদেন চালু হলে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব মানুষ নিয়মিত স্বজন, শিক্ষার্থী বা পরিবারের সদস্যদের কাছে টাকা পাঠান, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করবে।
একই সঙ্গে ব্যাংক, এমএফএস ও অন্যান্য পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মধ্যে আন্তঃসংযোগ বাড়লে একটি অভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য অনুযায়ী, নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল পেমেন্টের দিকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আরও দ্রুত করতে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। P2P সুবিধা, মার্চেন্ট পেমেন্টে শূন্য চার্জ এবং ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর পরিশোধের মতো ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে।