![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়ে আগামী মাসের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ধরে রাখা ও ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘আসিয়ান অঞ্চলে হালাল ইকোসিস্টেম: বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ তথ্য জানান।
এলডিসি উত্তরণের পর বাড়বে চ্যালেঞ্জ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের অন্যতম প্রধান বাজার। বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ ইইউর বাজারে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ বা ইবিএ সুবিধা পাচ্ছে। এই সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে অধিকাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য এই বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে থাকবে না। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এখন থেকেই বিকল্প বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এই বাস্তবতায় ইইউর সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার।
ভিয়েতনাম-ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা
ইউরোপের তৈরি পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ও ভারত ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষর করেছে। ফলে এসব দেশের রপ্তানিকারকেরা ইউরোপের বাজারে তুলনামূলক সুবিধাজনক বাণিজ্যিক পরিবেশ পেতে পারেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ইউরোপের বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে এফটিএ বা সমজাতীয় বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ইইউর সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আলোচনা করে আসছে। এখন এ বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী সরকার।
তবে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল ইউরোপে যাবে, নাকি ইইউর প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে এফটিএর উদ্যোগ
শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এফটিএ দ্রুত স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১২টি দেশের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই বিভিন্ন দেশের বাজারে দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য Preferential Market Access বা অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা।
এর ফলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে শুল্ক ও বাণিজ্যিক সুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলা করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হালাল অর্থনীতিতে বড় সম্ভাবনা বাংলাদেশের
সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের হালাল অর্থনীতির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।
তার মতে, হালাল অর্থনীতিকে শুধু খাদ্য ও পানীয় খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বর্তমানে হালাল অর্থনীতি খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, মোডেস্ট ফ্যাশন, পর্যটন, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনসহ বিভিন্ন খাতকে ঘিরে একটি বড় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারলে নতুন রপ্তানি সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হালাল খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী ও পোশাক খাতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে নতুন কৌশল
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এলডিসি-পরবর্তী সময়ের জন্য নতুন বাণিজ্য কৌশল গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো এবং নতুন বাজারে প্রবেশের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ইইউর সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হলে শুল্ক সুবিধা, বাজারে প্রবেশাধিকার, পণ্যের মান, বাণিজ্যনীতি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং হালাল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সেমিনারে বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রেদওয়ানুর রহমান স্বাগত বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর।