• হোম > বিদেশ > কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত ২৫৪

কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত ২৫৪

  • বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৪৩
  • ৫০

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কলম্বিয়া। ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে ভবন, বাড়িঘর, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৫৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কয়েক হাজার মানুষ আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের অনেককেই নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।

সোমবার ভোরে আঘাত হানা শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতার কারণে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। স্বজনদের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপের কাছে ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে জীবিতদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলজুড়ে ভূমিকম্পের তীব্র কম্পনে অসংখ্য ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও ভবন হেলে পড়েছে, আবার কোথাও পুরো কাঠামো ধসে পড়েছে।

পেরেইরা ও কালীতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি

মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ২৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর পেরেইরায় ১০১ জন এবং দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতে ৯৫ জন নিহত হয়েছেন।

ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরমুখী বনাঞ্চলীয় চোকো অঞ্চলের বহু আদিবাসী সম্প্রদায় এখনো বিদ্যুৎ ও মৌলিক সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দুর্গম এসব এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভূমিকম্পটি এমন এক সময়ে আঘাত হেনেছে, যখন দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েলা শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন পার করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে তিনি বাড়িঘর হারানো মানুষদের অর্থনৈতিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের খুঁজছেন উদ্ধারকারীরা

সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত উদ্ধারকর্মীরা ক্রেন, ভারী খননযন্ত্র এবং নিজেদের হাত ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যন্ত্রপাতি পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় অনেক জায়গায় স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন।

মানবশৃঙ্খল তৈরি করে একে অন্যের হাতে বালতি তুলে দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও সামান্য শব্দ পেলেই উদ্ধারকর্মীরা থেমে যাচ্ছেন এবং আটকে থাকা মানুষের সন্ধান করছেন।

পেরেইরায় স্বামী ও ১০ মাসের শিশুকে নিয়ে একটি অতিথিশালায় ছিলেন রোসা গনজালেজ। ভূমিকম্পের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ভবনটি হঠাৎ কাঁপতে ও কড়কড় শব্দ করতে শুরু করে। তারা বাইরে বেরিয়ে আসার পরপরই ভবনটি ধসে পড়ে।

রোসার ভাষ্য অনুযায়ী, অতিথিশালাটিতে থাকা প্রায় ২০ জনের মধ্যে মাত্র আটজন জীবিত বের হতে পেরেছেন। একজন বয়স্ক ব্যক্তি ভবনের একটি টেরেসে আটকা পড়েছিলেন। তার ভাগ্য নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রোসা।

আতঙ্কে খোলা আকাশের নিচে মানুষ

ভূমিকম্পের সময় পেরেইরা বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার হোসে গায়েগো। তিনি তখন লাইভ ভিডিও করছিলেন। ভূমিকম্পের তীব্র কম্পনের সময় ছাদের কিছু অংশ ভেঙে পড়লে একটি টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন তিনি।

গায়েগোর বর্ণনায়, চারদিকে আহত ও রক্তাক্ত মানুষকে দেখা যাচ্ছিল। অনেকে পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছানোর জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলেন।

ভূমিকম্পের পর তিনি সারা রাত ঘুমাতে পারেননি। পরাঘাতের আশঙ্কায় খোলা জায়গায় অবস্থান করেন। মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত প্রায় ১০০টি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

কালিতে মর্গে জায়গা নেই

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি কালী। সেখানে বাসিন্দারা রাস্তায় রান্না করছেন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।

ধসে পড়া টোরেস দেল লিমোনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের সামনে উদ্ধারকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভিড় দেখা গেছে। একসময় গাছপালায় ঘেরা অভিজাত আবাসিক এলাকায় বহুতল দুটি ভবন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কমপ্লেক্সটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক নারীকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনলে সেখানে উপস্থিত মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তবে বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে শহরটিতে। কালী শহরের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সচিব জার্মান এসকোবার জানিয়েছেন, শহরের মর্গ ইতোমধ্যে মরদেহে পূর্ণ হয়ে গেছে। রাস্তায় পড়ে থাকা আরও মরদেহ উদ্ধার করে সেখানে নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও ব্যাপক

কলম্বিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কফি উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতেও ভূমিকম্পের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। দেশটির ন্যাশনাল কফি ফেডারেশন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে কৃষিখামার ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও নিরূপণ করা হচ্ছে।

ভূমিকম্পের পর বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও অন্যান্য মৌলিক সেবা ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

এদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান যত এগোবে, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা ততই স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে কলম্বিয়ায় ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15160 ,   Print Date & Time: Tuesday, 29 September 2026, 06:09:08 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh